লিঙ্গ বা যৌন পরিচয় দেখে শিল্পীসত্ত্বার বিচার অনুচিত: রাকেশ ঘোষ, নাট্যকার

0
1362
লিঙ্গ বা যৌন পরিচয় দেখে শিল্পীসত্ত্বার বিচার অনুচিত: রাকেশ ঘোষ,নাট্যকার
লিঙ্গ বা যৌন পরিচয় দেখে শিল্পীসত্ত্বার বিচার অনুচিত: রাকেশ ঘোষ,নাট্যকার

দেবুদা (দেবশংকর হালদার) অভিনেতাই নন। একাডেমীর কাউন্টারের চন্দনদাও অনায়াসে ওইরকম অভিনয় করতে পারে।
অপর্ণা সেন আর কী এমন নারীবাদী চলচ্চিত্র বানিয়েছেন, ওরকম আমার গৃহবধূ মাও পারে।
‘আজ জ্যোৎস্না রাতে সবাই গেছে বনে’ শুধু রবীন্দ্রনাথ কেন, যে কোনও লোকই তার ছেলে মরলে ফসফস করে লিখে ফেলে এমন গান।

গালাগালি খেতে খেতে আরও দু’একটা কথা বলে নিই।

আমার মনে হয় কারও লিঙ্গ বা যৌন পরিচয় দিয়ে তাঁর শিল্পী সত্তাকে বিচার করা অনুচিত।

তৃতীয় সত্তা নিয়ে একাধিক নাটক লিখে, পরিচালনা করে, প্রযোজনা করে দেখলাম, বাস্তব জীবনে কোনও নারীসুলভ চেহারা ও ভঙ্গির পুরুষ অভিনেতা যদি অতি দক্ষতার সঙ্গেও নারীচরিত্রে বা তৃতীয় সত্তার চরিত্রে অভিনয় করেন, তাহ’লেও তাঁর সেই ক্ষমতাকে আন্তরিক সম্মান না-জানিয়ে অনায়াসে তাচ্ছিল্য করেন অনেকেই। বলেন : “ও তো ভাল করবেই”। বা, “ও ‘ওইরকম’ বলেই এতো ভাল করেছে”। এঁরা গভীর মননশীল, নিবিড় বিশ্লেষক, সর্বোপরি নিয়মিত নাট্যচর্চাকারী। অর্থাৎ, এঁদের বক্তব্য অনুযায়ী, কোনও পুরুষ অভিনেতার পুরুষ চরিত্রে, বা স্ত্রী অভিনেতার নারী চরিত্রে অভিনয় করায় কোনও কৃতিত্ব নেই। আজ পর্যন্ত দেবুদা, সব মাধ্যমেই, যত চরিত্রে অভিনয় করেছেন সবগুলোই পুরুষ চরিত্র এবং যৌন পরিচয়ে বিপরীতকামী। ব্যক্তিজীবনেও তিনি তাই-ই। তাহ’লে আর কী? দেবুদার অভিনয়-ক্ষমতা শূন্য, আর যেহেতু কাউন্টারের চন্দনদাও লিঙ্গ এবং যৌন পরিচয়ে দেবুদার সমগোত্রীয় অতএব চন্দনদাও অনায়াসে দেবুদা অভিনীত চরিত্রগুলোকে একই দক্ষতায় ফুটিয়ে তুলতে পারে। অপর্ণা সেন-আমার মা, রবীন্দ্রনাথ-যে কোনও বাবা তুলনাগুলো এবার কোন অর্থে বুঝলেন তো?

তবে, হাসবেন না। সব মূর্খামিই হাস্যকর নয়, ভয়ঙ্করও, আতঙ্কেরও।

আমার ‘ঋতুপর্ণ ঘোষ’, ‘রাজকুলগাথা’, ‘মায়ামৃদঙ্গ’- তিনটে নাটকেই রঞ্জন ( রঞ্জন বোস Ranjan Bose Joy ) তৃতীয় সত্তার চরিত্রে দাপট ও দক্ষতার সঙ্গে অভিনয় করেছে। তিনটে চরিত্রের যৌন পরিচয় এক হ’লেও মনস্তাত্ত্বিক পরিচয় সম্পূর্ণ পৃথক। ‘মায়ামৃদঙ্গ’র ‘সুবর্ণ’ – আজ থেকে ষাট বছর আগের বাংলার এক প্রত্যন্ত গ্রামের আলকাপের ছোকরা যে আসরের জীবন আর আসরের বাইরের জীবনের জটিল দ্বন্দ্বে দীর্ণ; ‘ঋতুপর্ণ ঘোষে’র ‘অপ্রতিম’ – লেক রোডের এ্যাড্ এজেন্সির রিনাউন্ড গ্রাফিক ডিজাইনার যে কখনও লাঞ্ছিত হয় লেকের গুণ্ডাদের হাতে, কখনও লেক থানার অফিসারের হাতে, কখনও নিজের ঘনিষ্ঠ আত্মীয়ের হাতে; আর ‘রাজকুলগাথা’র ‘অম্বা’ – মহাভারতের এক অপমানিতা রাজকন্যা যে প্রেমিক তথা সমগ্র পুরুষজাতির উপর প্রতিশোধ নিতে নিজের লিঙ্গ পরিবর্তন করে অস্ত্র হাতে নেয়। স্বভাবতই চরিত্রগুলোর চলন, বলন, মনন, বহিরঙ্গ, অন্তরঙ্গ একে অন্যের থেকে পৃথক, চরিত্রায়ণও পৃথক, অভিনয়ও অবশ্যই পৃথক। পশ্চিমবঙ্গের প্রায় সব পত্র-পত্রিকা, বিদ্বজ্জনেই মুক্তকন্ঠে রঞ্জনের অভিনয়ের প্রশংসা করেছেন। অবশ্য, সেই কতিপয় নিবিড় বিশ্লেষক তখনও বলেছেন, “রঞ্জন বোধহয় এই ধরণের চরিত্র ছাড়া পারে না, তাই না?” “রঞ্জনের এবার অন্য চরিত্রেও অভিনয় করা উচিত।” যদিও একই সময়ে ‘কুমারসম্ভবের কবি’তে সাফল্যের সঙ্গে রঞ্জন কালিদাসের চরিত্র রূপায়ণ করেছিল, ‘লাজবর্ষণে’ একাত্তরের মুক্তিযোদ্ধা জহির, তবুও যদি রঞ্জন সারাজীবন শুধুমাত্রই তৃতীয় সত্তার চরিত্রে অভিনয় করে তাতেই বা কী সমস্যা হয়? একজন পুরুষসুলভ চেহারার ও ভঙ্গির অভিনেতার যদি সারাজীবন পুরুষ চরিত্রেই অভিনয় করায় কোনও অস্বীকার না-থাকে,তাহ’লে একজন নারীসুলভ চেহারা ও ভঙ্গির পুরুষ অভিনেতার সারাজীবন সেই ধরণের চরিত্রে অভিনয় করা স্বীকৃত হবে না কেন? আমাদের বাংলা নাটকের ঐতিহাসিক ঐতিহ্য তো এতো সংকীর্ণ নয়। যে সময় বাংলা নাটকে ভাল পুরুষ অভিনেতারই আধিক্য, ভাল মহিলা অভিনেতা নগণ্য, এবং যে সময় বিনোদিনী দাসী খ্যাতি ও গ্ল্যামারের প্রায় মধ্যগগনে, ঠিক সেই সময়ে ‘বাংলা নাটকের গ্যারিক’ পুরুষ-অভিনেতার পরিবর্তে বিনোদিনীকে দিয়ে পুরুষ চরিত্রে অভিনয় করান ‘চৈতন্যলীলা’য়। এরপরেও গভীর মননশীল নাট্যচর্চাকারী নিবিড় বিশ্লেষকদের মন্তব্যে কি শুধুই হাসবো, চিন্তিত হবো না? কারণ, এঁরা এঁদের বক্তব্য মন্তব্য প্রকাশ করেই যাচ্ছেন, যা আমাকে স্পর্শ না-করলেও রঞ্জন এবং রঞ্জনের মতো অভিনেতাদের শিল্পীসত্তাকে আহত করছে বারবার। গত ২৩শে মে মায়ামৃদঙ্গ’র অভিনয়ের পর এই ধরণের সমালোচনার মুখোমুখি হয়েছে অনিন্দ্য রায় ( Aninda Roy )। “অনিন্দ্য তো নাচের ছেলে, ছোকরার চরিত্র তো ভাল করবেই, তাছাড়া নাচের ছেলেরা মেয়েলি হয়ই”- এই-ই তাঁদের বক্তব্য। বুঝুন, অনিন্দ্য মেয়েলি, ছেলেলি, না ব্রুসলি সেটাই এঁদের বিশ্লেষণের বিষয়, অনিন্দ্য’র অভিনয় নয়! সদ্য নাটকে আসা ছেলেটি স্বাভাবিকভাবেই এই ধরণের সমালোচনায় দমে গেছে বেশ খানিকটা। এরপর তো আগ্রহ কমে যাবে!

অথচ এই প্রণম্য বিশ্লেষকের দল গতকাল (৩০শে মে,২০১৭) ফেসবুকে ভার্চুয়াল অশ্রুপাত করতে করতে সাড়ম্বরে উদযাপন করেছেন তাঁদের ‘ঋতু’, ‘ঋতুদা’র প্রয়াণবার্ষিকী; এই বিদগ্ধ নাট্যউদ্ধারকারীরা চপলদার ( চপল ভাদুড়ী) র বঙ্গবিভুষন প্রাপ্তি তে আহ্লাদে আটখানা হয়ে একাডেমি চত্তরে গড়াগড়ি খেয়েছেন। এই মননশীলরাই রাহুল বোসের অভিনয় দেখে দাড়ি চুলকে ভাঁড়ের চা চল্কে মতামত দেন। কিন্তু সমকালে দাঁড়িয়ে রঞ্জনের অভিনয় কে তাচ্ছিল্য করেন।
ত্রাস। আতঙ্ক।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here