দশচক্র/ অষ্টম পর্ব // সিদ্ধার্থ সিংহ

0
674

দশচক্র/ অষ্টম পর্ব // সিদ্ধার্থ সিংহ

                                   আট                                                                          বেলা তিনটে নাগাদ টেলিফোন ভবনের নীচে এসে দাঁড়াল ঋজু। অনেক দিন পর এ রকম সময় ও এল। আগে প্রায়ই আসত। ওর জন্য টিফিন দিয়ে যেত। আপেল, আমসত্ত্ব, কাজু, কিসমিসের প্যাকেট, দই, সন্দেশ। কিন্তু কোনও দিনই আঙুর আনত না। প্রথম দিন আঙুর দেখেই কণিকা বলেছিল, আমি আঙুর খাই না। ওটা ঠাকুরের নামে উত্‌সর্গ করে দিয়েছি।

অত টিফিন দেখে কণিকা বলেছিল, এত খাবে কে?

— তুমি।

— পাগল নাকি? এ তো আমার এক সপ্তাহের টিফিন।

— যতটা পারবে, খাবে। না খেতে পারলে ফেলে দেবে।

— পয়সার জিনিস ফেলে দেব?

— তা হলে অন্যদের দিয়ে দিও।

তখন প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে ও। টিফিন দিতে আসার জন্য ঋজুকে অনেক আগে বাড়ি থেকে বেরোতে হত। তাই কণিকাই একদিন বলেছিল, শুধু শুধু এ সব দেওয়ার জন্য তোমাকে এত আগে বাড়ি থেকে বেরোতে হবে না। আমাদের বেয়ারাটাকে দিয়ে আমি যা হোক কিছু আনিয়ে নেব।

তা সত্ত্বেও মাঝে মাঝেই এটা ওটা সেটা নিয়ে ও চলে আসত। কিন্তু ওর আজকের আসাটা একদম অন্য কারণে।

সে দিন ওর অফিসের কাছে এসেও ঋজু কোনও ফোন করেনি। কণিকা বুঝি ভাবতেই পারেনি, ও আসবে। তাই গেটের কাছে ওকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে চমকে গিয়েছিল সে। ওকে দেখে ঋজুরও কেমন যেন সন্দেহ হয়েছিল। ও তো এমনিতে এত সাজে না! তা হলে কি ও অন্য কোথাও যাবে!

ঋজুর সঙ্গে ও যখন প্রথম প্রথম দেখা করত, তখন ঠিক এ রকমই সাজত।

কণিকা জিজ্ঞেস করল, তুমি হঠাত্‌?

— হঠাত্‌ কোথায়? আমি তো আসিই।

— কই, কাল তো আসোনি। পরশুও আসোনি। তার আগের দিনও বোধহয় না।

— দু’-একদিন আসিনি দেখে কি কোনও দিনই আসব না?

— আমার একটু কাজ আছে।

— কোথায়?

— অনিতায় যাব।

— অনিতা? মানে দেশপ্রিয় পার্কের ওখানে? ওই লেডিজ টেলারের কাছে?

— হ্যাঁ। দুটো ব্লাউজ করতে দেওয়া আছে।

— তুমি থাকো সেই সল্টলেকে। আর ব্লাউজ বানাতে দাও দেশপ্রিয় পার্কে।

— ওরা ভাল বানায়, তাই।

— ঠিক আছে চলো, আমি যাচ্ছি।

— তোমার অফিস নেই?

— পরমার্থদাকে বলা আছে।

— তুমি অনিতায় যাবেই?

— হ্যাঁ।

— সে যেতে পারো। কিন্তু আমি আবার ভাবছি, রেডি আছে তো?

— দেওয়ার ডেট কবে?

— গত কাল না পরশু ছিল।

— বিলটা দেখি।

কণিকা ব্যাগ হাতরাতে লাগল। এক বার এই চেন খোলে, এক বার ওই চেন। এক বার এই খোপ তো এক বার ওই খোপ। ঋজু বলল, কোথায় রেখেছিলে?

— ব্যাগেই তো রেখেছিলাম।

— ভাল করে দেখো।

— দেখছি তো।

— বিল না হলে দেবে?

কণিকা বলল, এমনি আমাকে চেনে। বহু দিন থেকে ওখানে করাচ্ছি তো। কিন্তু বিল না হলে ওরা দেবে কী করে? বিলের নম্বর দেখেই তো ওরা বার করে।

— তা হলে আজকে ছেড়ে দাও। বাড়ি গিয়ে খুঁজে দেখো, অন্য কোথাও রেখেছ কি না। না পেলে, আগে ফোন করে কথা বলে তার পরে যেও।

— ঠিক আছে তাই করি। ওই যে চোদ্দো নম্বর, আমি আসি। ট্রামটা থামতেই কণিকা উঠে পড়ল। ওর পেছনে পেছনে ঋজুও। রাজাবাজার ট্রাম ডিপোতে নেমে ওরা যখন অটো ধরার জন্য হাঁটতে হাঁটতে রাজাবাজার মোড়ের দিকে যাচ্ছে, কণিকার ফোন বেজে উঠল। কণিকা সে দিকে কর্ণপাত না করে ঋজুকে বলল, তুমি এ ভাবে চলে এলে, কোনও অসুবিধে হবে না তো? আগে কিন্তু অফিস, এটা মনে রেখো। আচ্ছা, এ বার হলদিয়ার অনুষ্ঠানটা হচ্ছে না? তপনদাকে কিন্তু আগে থেকে বলে রেখো, আর যাকে যাকে বলার, মনে করে বোলো, এ বার যেন কোথাও বাদ না যাই।

গত বছর তপন বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রণব চট্টোপাধ্যায় থেকে শুরু করে সমরেন্দ্র সেনগুপ্ত, সবাইকে ঋজু ধরেছিল, যাতে পঁচিশে বৈশাখে রবীন্দ্র সদনের কবিতা পাঠে কণিকার নামটা থাকে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত যে কোনও কারণেই হোক, ওর নামটা ছিল না। পরে তপনদা বলেছিলেন, সামনের বার একটু আগে থেকে মনে করিয়ে দিও।

রাজাবাজার থেকে ওরা যখন অটোয় উঠল, আবার বেজে উঠল কণিকার ফোন। ঋজু বলল, তোমার ফোন বাজছে।

— তাই? যেন শুনতেই পায়নি, এমন ভান করে ব্যাগের সামনের খোপ থেকে ফোনটা বার করে অন করল কণিকা। চারিদিকে গাড়ির এত প্যাঁ পুঁ, অটোর ঝাঁকুনি আর তার মধ্যে এত নিচু স্বরে কণিকা কথা বলছে যে, সে কী বলছে, কিছু শোনা তো দূরের কথা, ওর মুখের ভঙ্গিমা দেখেও বোঝার উপায় নেই, ঝগড়া করছে না প্রেম করছে।

ওদের কমপ্লেক্সের গেটের কাছে দাঁড়িয়ে কণিকা বলল, তা হলে ঠিক আছে। তুমি অফিসে পৌঁছে কিন্তু একটা ফোন করে দিও।

— চা খাওয়াবে না?

— যাবে? কথাটা এমন ভাবে কণিকা বলল, ঋজু বুঝতে পারল, ও মনেপ্রাণে চাইছে, সে যাতে ওর বাড়িতে না যায়।

মহাদেববাবু এ সময় থাকেন না। মেয়েরাও পড়তে যায়। দরজা খুলে ঘরে ঢুকে কণিকা বসে পড়ল খাটের এক ধারে। যেখানে ছোট্ট একটা তেপায়ার উপরে রাখা আছে ল্যান্ড ফোন।

আগে ঘরে ঢুকলেই কণিকা শাড়ি ছেড়ে হাত-মুখ ধুয়ে শালোয়ার কামিজ পরে নিত। এবং অবাক কাণ্ড, প্রত্যেক বার কামিজটা উল্টো করে পড়ত। শুধু কণিকাই নয়, বড় বাবি ছোট বাবিরাও বাড়িতে যখন থাকে, উল্টো করেই জামাকাপড় পরে। কিন্তু সে দিন ঋজু দেখল, কণিকা বসেই আছে। শাড়ি ছাড়ার নাম নেই। হাত-মুখ ধোয়ার বালাই নেই। চা করা তো অনেক পরের ব্যাপার।

খুব বেশি হলে পাঁচ-সাত মিনিট। ল্যান্ড ফোন বেজে উঠল। কণিকা খাটের এক ধারে বসে। তার সামনে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ঋজু। ফোন ধরার জন্য ঋজু হাত বাড়াতেই, তার আগেই ফোনটা তুলে নিল কণিকা, হ্যাঁ, পৌঁছে গেছি। পরে ফোন করছি।

ঋজুর সন্দেহ দানা বাঁধছে। ও জিজ্ঞেস করল, কে?

— আমার এক বন্ধু।

— কী নাম?

— তুমি চিনবে না।

— নামটা বলো না।

— নাম বললে চিনবে?

— তোমার বলতে অসুবিধে কোথায়?

— অসুবিধে আছে। বলেই, শাড়ি ছাড়তে লাগল ও।

মাসখানেক আগে একটা ছেলে এসেছিল ঋজুর কাছে। নাম দীপঙ্কর। অল্প বয়স। ভীষণ স্মার্ট। লেখালিখি করতে চায়। বিশেষ করে ইনভেস্টিগেশন রিপোর্ট। যাবার সময় তার নম্বরটা দিয়ে গিয়েছিল সে। ঋজু তাকে ফোন করে অফিসে আসতে বলেছিল।

রিসেপশনে বসে তাকে বলেছিল, তোমাকে একটা কাজ করতে হবে। কেউ যেন টের না পায়। জানো তো, বিশ্বের সমস্ত এডস রোগীরা মিলে একটা সংগঠন তৈরি করেছে। তারা ইন্টারনেটের মাধ্যমে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের লোকেদের সঙ্গে বন্ধুত্ব পাতাচ্ছে। গিফট পাঠাচ্ছে। এবং সম্পর্ক একটু ঘনিষ্ঠ হলেই সেই দেশে গিয়ে তার সঙ্গে দেখা করছে। প্রেমের ফাঁদে জড়িয়ে নিচ্ছে। বিয়ে করার প্রলোভন দেখিয়ে তার সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করছে। আর এই ভাবেই সুস্থ লোকেদের শরীরে এডসের বীজ বপন করে তারা কেটে পড়ছে।

— তাই নাকি? দীপঙ্কর অবাক।

— শুধু তাই নয়, সেই সংগঠন সারা পৃথিবীর বিভিন্ন বড় বড় শহরে তাদের শাখা অফিসও খুলেছে। যাদের উদ্দেশ্য ওই একই। সম্প্রতি কলকাতাতেও এ রকম একটা চক্রের সন্ধান পেয়েছি আমরা। কিন্তু আমাদের কারও পক্ষে এই কাজটা করা খুবই মুশকিল। কারণ, অনেকেই আমাদের চেনে। তাই, আমরা এমন একজনকে চাইছি, যাকে কেউ চেনে না, একদম আননোন। যে ছায়ার মতো অনুসরণ করে পুরো ঘটনাটা বার করে আনতে পারবে। ওরা কাদের সঙ্গে মিশছে। কোথায় মিট করছে। এবং কী ভাবে এই চক্রটাকে চালাচ্ছে, সব, সব।

— কিন্তু আমি তো কাউকে চিনি না।

— আমি একজনের খোঁজ পেয়েছি। সে টেলিফোন ভবনে কাজ করে। ছুটির পরে এই কাজে মেতে ওঠে। তাকে দু’-চার দিন ফলো করলেই তুমি সব খোঁজ পেয়ে যাবে। সে কোথায় কোথায় যাচ্ছে, কার কার সঙ্গে দেখা করছে, সব। আর জানামাত্র তুমি আমাকে সঙ্গে সঙ্গে রিপোর্ট করবে। ও বাসে উঠলে তুমিও বাসে উঠবে। ও ট্যাক্সি নিলে তুমিও ট্যাক্সি নেবে। ও যদি কোনও হোটেলে গিয়ে ঢোকে, তুমিও সেই হোটেলে ঢুকবে। বুঝেছ? দু’-চার দিন একটু ছায়ার মতো লেগে থেকে দেখো তো, কোনও খবর পাও কি না। এই নাও, এই কাজে তো অনেক খরচ আছে। আপাতত এই ক’টা টাকা তোমার কাছে রাখো। বলেই, তার দিকে পাঁচশো টাকা এগিয়ে দিয়েছিল। তার পরে বলেছিল, লাগলে, পরে আবার দেবো। কেমন?

দীপঙ্কর অত্যন্ত উত্‌সাহিত হয়ে রাজি হয়ে গিয়েছিল। পর দিন বিকেলে কণিকা অফিস থেকে বেরোতেই, ঋজু তাকে দূর থেকে দেখিয়ে দিয়েছিল। ব্যাস।

রাতেই সব খবর ফোনে পেয়ে গিয়েছিল ঋজু। অফিস থেকে বেরিয়ে এ দিক ও দিক ভাল করে দেখে নিয়ে ডালহৌসির মিনিবাস স্ট্যান্ড থেকে একডালিয়ার মিনিতে উঠেছিল সে। তার পর সোজা গিয়ে নেমেছিল গড়িয়াহাটের মোড়ে। উল্টো দিকে আনন্দমেলার সামনে দাঁড়িয়েছিল একটি লোক। পরনে সাদা জামা সাদা প্যান্ট। কালো শ্যু। হাতে সাদা মোবাইল। তার সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে বালিগঞ্জ স্টেশনের দিকে কিছুটা গিয়ে, বিজন সেতুর একটু আগেই, রাস্তা পারাপার হওয়ার যে ওভার ব্রিজটা আছে, তার বাঁ দিকে ঘুরে একডালিয়া রোড ধরেছিল ওরা। এভারগ্রিন ক্লাবের উল্টো দিকে পারিজাত অ্যাপার্টমেন্টের পাশ দিয়ে ম্যান্ডেভিলা গার্ডেন্স ধরে সোজা এগিয়ে গিয়েছিল। তার পর বাঁ-হাতি রাস্তা ধরে ট্রাম রাস্তায় পড়ার আগেই, আই টি আই পাঁচিলের উল্টো দিকে ছোট্ট একটা রেস্টুরেন্ট— অ্যামব্রোসিয়া। তার দোতলায় উঠে গিয়েছিল ওরা।

দীপঙ্কর ভেতরে ঢোকেনি। বাইরে, একটু দূরে কোনাকুনি উল্টো ফুটপাথে অপেক্ষা করছিল সে। পনেরো মিনিট, কুড়ি মিনিট, আধ ঘণ্টা, পঁয়তাল্লিশ মিনিট। প্রায় এক ঘণ্টা হতে চলল। ওরা কখন বেরোবে কে জানে! সিগারেট ধরিয়ে দীপঙ্কর যখন একমনে টান দিচ্ছিল, হঠাত্‌ খেয়াল করল, ওরা দোতলা থেকে নেমে একটা ট্যাক্সিতে উঠছে। ট্যাক্সিটা ডান দিকে ঘুরে বালিগঞ্জ ফাঁড়ির দিকে চলে গেল।

— তুমি পেছনে গেলে না কেন?

দীপঙ্কর বলল, ওখানে আর ট্যাক্সি ছিল না।

— ওহ্‌। ঠিক আছে। কাল আর এক বার যেও।

— ও কে। কিন্তু কাল যে টাকাটা দিয়েছিলেন, তার প্রায় সবটাই খরচ হয়ে গেছে।

— ঠিক আছে, ঠিক আছে, তোমার কাছ থেকে এখন কাজ চালাও। পরে আমি দিয়ে দেবো।

পর দিন আবার ওদের পিছু নিয়েছিল দীপঙ্কর। এ বার আর ফোন নয়, রাতে সোজা ওর অফিসে চলে এসেছিল সে। বলেছিল, টেলিফোন ভবন থেকে ট্রামে করে ধর্মতলায় এসে, দূরপাল্লার বাসগুমটি থেকে একটা বাস ধরেছিল মেয়েটা। কত নম্বর ও জানে না। মেয়েটা উঠেছে দেখে সে-ও উঠে পড়েছিল। নেমেছিল উল্টোডাঙার মোড়ে। ক্যাপিটাল ইলেকট্রনিক্সের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল কালকের সেই লোকটা। তার সঙ্গে ও একটা গলির মধ্যে ছোট্ট রেস্তোরাঁয় ঢুকেছিল। বাইরে থেকেই ও খেয়াল করেছিল, ওরা একটা কেবিনে ঢুকে বসতেই বেয়ারা এসে পর্দা ফেলে দিয়েছিল। আধ ঘণ্টাটাক ছিল। তার পর বেরিয়ে হাঁটতে হাঁটতে হাটকোর মোড় পর্যন্ত এসে মেয়েটা উঠে গিয়েছিল অটোতে। আর লোকটা পঁয়তাল্লিশ নম্বর বাসে।

কণিকা কেন তার সঙ্গে এ রকম ব্যবহার করছে, ঋজুর কাছে এখন তা জলের মতো পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে । অথচ নিজে হাতে-নাতে ধরতে না পারলে কিছু বলতেও পারছে না। ভিতরে ভিতরে গুমরাচ্ছে। এই দুটি ঘটনা, বিশেষ করে কালকের ঘটনাটা ওকে এতটাই ছুঁয়ে গেছে যে, এই নিয়ে ও একটা কবিতাও লিখে ফেলেছে। মুখে কিছু বলতে না পারলেও, এই কবিতাটা শুনিয়েও তো ও তাকে বুঝিয়ে দিতে পারে, ও যেখানে যা করছে, ও সব জানে।

সেই কবিতাটা শোনানোর জন্যই সকালে ও ফোন করেছিল কণিকার অফিসে। ঋজুর ফোন বুঝতে পেরেই ও বলেছিল, এখন ভীষণ ব্যস্ত। যা বলার সংক্ষেপে বলো।

ঋজু বলেছিল, তা হলে এখন থাক। তোমার অফিস ছুটির পরে দেখা করে নেব।

ও বলেছিল, না, আজকে হবে না। আমি একটু অন্য জায়গায় যাব।

— অনিতায়?

— না। আমাদের অফিসের একজনের বিবাহ বার্ষিকী। সেখানে যাব।

— আমি পৌঁছে দিয়ে আসব?

— না। আমরা কয়েক জন কলিগ মিলে একসঙ্গে যাব।

— তা হলে!

— তোমার যদি খুব দরকার থাকে, দুপুরের দিকে আসতে পারো।

— ক’টায়?

— দুটো, আড়াইটে, তিনটে।

তাই তিনটে নাগাদ ওর অফিসের নীচে এসেছে ঋজু। এসেই, ফোন করেছে কণিকাকে। দু’মিনিটও লাগেনি। কণিকা নেমেই বলল, যা বলার তাড়াতাড়ি বলো। অনেক কাজ আছে।

ঋজু বলল, একটা কবিতা লিখেছিলাম। তোমাকে শোনাতে চাই।

— শোনাবার কী আছে, যখন ছাপা হবে, দেখে নেব।

— না, আসলে তোমাকে নিয়ে লেখা তো।

— ঠিক আছে, তাড়াতাড়ি পড়ো।

ঋজু পড়ছিল। কবিতা শেষ হওয়ার আগেই কণিকা বলল, সব মিথ্যে। বানিয়ে বানিয়ে কী সব হাবিজাবি লেখো।

— সব বানানো?

— হ্যাঁ। বানানো।

— লোকটা কে?

— বাজে কথার উত্তর দেওয়ার মতো সময় নেই আমার। আমি চললাম। গটমট করে অফিসের ভিতরে ঢুকে গেল ও।

ঋজু যখন রাতে ওর বাড়িতে ফোন করল, কণিকাই ধরল। কী চাই?

— লোকটা কে?

— যেই হোক, তোমার জেনে লাভ?

— বলবে না?

— আচ্ছা, কে কী বলল, কোথায় হাবিজাবি কী শুনলে, সে সব নিয়ে ঝগড়া করতে তোমার খুব ভাললাগে, না?

— কথা ঘুরিয়ো না। আমি যে প্রশ্ন করছি, তার উত্তর দাও।

— আমি ফালতু কথার উত্তর দিই না।

— এটাই তোমার শেষ কথা?

— বললাম তো। তোমার যদি ভাল না লাগে অন্য রাস্তা দেখো। আমার কাছে আসতে হবে না। প্রচুর মেয়ে বাজারে ঘুরছে, যে কোনও একটা ধরে নাও।

— এই সব কি যা তা বলছ?

— তোমার মতো ছেলের সঙ্গে এর থেকে ভাল ভাবে কথা বলা যায় না।

— তা হলে তুমি বলবে না? তাই তো?

— না-বলার কিছু নেই। তুমি তাকে চেনো। তোমাদের অফিসেই কাজ করে।

— আমাদের অফিসে? কী নাম?

— নাম বলব না।

— কোথায় আলাপ হল?

— যে দিন তোমাকে নিয়ে মুক্তাঙ্গনে ঋজু সন্ধ্যা হল, সে দিন ওই অনুষ্ঠানে যাবার জন্য আমি সিটিসি-তে উঠে দরজার কাছে দাঁড়িয়েছিলাম। বাসটায় এত ভিড় ছিল যে, গড়িয়াহাটের মোড়ে বাসটা দাঁড়াতেই, ভিতর থেকে হুড়মুড় করে সব নামতে লাগল। ঠেলাঠেলিতে আমিও নেমে পড়লাম। ওই বাসে আর উঠতে পারিনি। কে যেন হিল জুতো দিয়ে আমার পা-টা মাড়িয়ে দিয়েছিল। খুব লেগেছিল। আমি যখন রাস্তার এক ধারে গিয়ে একটু নিচু হয়ে পা দেখছি, পাশ থেকে একজন বলে উঠেছিল, কী হয়েছে, লেগেছে? ‘হ্যাঁ’ বলতেই ছেলেটি রাস্তার উপরেই হাঁটু গেড়ে বসে আমার পা দেখতে লাগল। বারণ করা সত্ত্বেও পকেট থেকে রুমাল বার করে আমার পা মুছতে মুছতে বলল, ছুলে গেছে তো… দাঁড়ান, একটা ব্যান্ডেড নিয়ে আসি।

মাত্র কয়েক মুহূর্ত। কোত্থেকে একটা ব্যান্ডেড নিয়ে এসে ক্ষতস্থানে লাগিয়ে দিল সে। জিজ্ঞেস করল, কোথায় যাবেন? আমি বললাম, রাসবিহারীতে। মুক্তাঙ্গনে। ও বলল, চলুন। আমিও ওই দিকে যাব।

অটো করে যখন প্রিয়ার সামনে দিয়ে যাচ্ছি, কানের কাছে মুখ নিয়ে এসে ছেলেটা ফিসফিস করে বলল, মুক্তাঙ্গনে যাচ্ছেন? এ দিকটা বোধহয় ভাল করে চেনেন না, না? প্রথম বার যাচ্ছেন, তাই তো? চিন্তা করবেন না, আমি আপনাকে পৌঁছে দেব। তবে, তার আগে একটা ছোট্ট কাজ আছে। একটু কফি কিনব।

কফি? কফি তো যে কোনও দোকানেই পাওয়া যায়! আমি কী ভাবছি, ছেলেটা বোধহয় বুঝতে পেরেছিল। বলল, এ কফি লেক মার্কেট ছাড়া আর কোথাও পাবেন না। র কফি। এখানে একশোরও বেশি রকমের কফি পাওয়া যায়। এরা শুধু কফিই বিক্রি করে। আমিও মনে মনে ভাবলাম, তা হলে এক বার দেখেই যাই দোকানটা।

কফি কেনার পরে ছেলেটা বলল, এখানে সাউথ ইন্ডিয়ান ফুডের খুব ভাল একটা রেস্তোরাঁ আছে, যাবেন? আমি বললাম, কোথায়? ছেলেটা বলল, এই তো সামনেই, প্রেমা ভিলা।

আর চুপ করে থাকতে পারল না ঋজু। বলল, সে কী! তুমি তাকে চেনো না, জানো না। রাস্তার একটা ছেলে বলল, আর অমনি তুমি তার সঙ্গে চলে গেলে?

— হ্যাঁ। এমন করে বলল, না করতে পারলাম না।

— তার পর?

— মুখোমুখি বসে যখন মশলা ধোসা খাচ্ছি, দেখি, খাবে কী, ছেলেটা আমার মুখের দিকে হা করে তাকিয়ে আছে। আমি বললাম, কী দেখছেন? ও বলল, আপনাকে। আমি কী বলব, বুঝতে পারলাম না। কথায় কথায় ও জেনে নিল, আমি কোথায় কাজ করি। আমি বিবাহিত কি না। ক’টা সন্তান। সব, সব। তার পর বলল, আমি যদি মাঝে মাঝে আপনার সঙ্গে দেখা করি, আপনার কোনও অসুবিধে নেই তো?

— তুমি রাজি হয়ে গেলে?

কণিকা বলল, এমন করে বলল, তা ছাড়া তুমিও তখন রেগুলার আসছ না। কী করব!

— বয়স কী রকম?

— বয়স? কত হবে! বছর তিরিশ-বত্রিশ। আমার ভাইয়ের চেয়েও ছোট হবে।

একটু রেগে গিয়ে ঋজু বলল, তাতেই তুমি মজে গেলে?

— আবার বাজে কথা বলছ।

— আমি নই। বাজে কথা বলছ তুমি। এতক্ষণ যেটা বললে পুরোটাই মিথ্যে।

কণিকা বলল, মিথ্যে হলে মিথ্যে।

— সত্যি কথা বলো।

— সত্যি কথা? ঠিক আছে, তা হলে তাই বলি। আমাদের অফিসের যে অনুষ্ঠানটা ছিল, মনে আছে? রোটারি সদনে?

মনে করার চেষ্টা করল ঋজু, রোটারি সদনে!

— তাও ভুলে গেছ, না? তা, সেখানে ওই প্রোগ্রামটা ও কভার করতে এসেছিল। আমি তো মঞ্চের পেছনে ছিলাম। সবাইকে ব্রোসিয়র-ট্রোসিয়র দিচ্ছিলাম। যাওয়ার সময় গেস্টদের, প্রেসের লোকজনদের মিষ্টির প্যাকেট-ট্যাকেটগুলো দিচ্ছিলাম। তখনই ওর সঙ্গে আলাপ।

— ব্যাস? তার থেকে একেবারে প্রেম? শুতে চলে গেলে?

— এই, একদম বাজে কথা বলবি না।

ঋজু অবাক। সে কী এমন বলল যে কণিকা একেবারে তুমি থেকে তুই-তোকারিতে নেমে এল! তবু বলল, বাজে কথা?

— বাজে কথা নয় তো কি? আমাকে কোনও দিন তুই ফোন করবি না। যদি ফারদার ভুল করেও করিস, আমি কিন্তু তোর বউকে ফোন করে সব বলে দেবো।

ও এত টেনশনে ছিল যে কণিকা কখন রিসিভার নামিয়ে রেখেছে, ঋজু বুঝতে পারেনি। ও একেবারে স্তব্ধ হয়ে গেল। এই জন্যই কি গত বছর তথ্যকেন্দ্রের পুজো সংখ্যায় কণিকার কবিতা ছাপার জন্য অরূপ সরকারের কাছে তাবেদারি করার সময় অরূপ ওকে বলেছিলেন, একে তুমি কত দিন চেনো?

তখন আবেগে হাবুডুবু খেতে খেতে ঋজু বলেছিল, জন্ম-জন্মান্তর থেকে।

অরূপ বলেছিলেন, তাই নাকি? তোমাদের এত প্রেম? চল্লিশ বছর বয়সের পরে আবার কোনও প্রেম হয় নাকি?

— তা হলে কী হয়?

— শুধু সেক্স।

— ওটা তোমার ভুল ধারণা। আমাদের কত দিনের প্রেম জানো?

— যত দিনেরই হোক, আমি তোমাকে হার্ট করতে চাই না, তবু বলছি, যখন ভাঙবে, এত ঠুনকো কারণে ভাঙবে, তুমি তা কল্পনাও করতে পারবে না।

— যাঃ। মুখে ‘যাঃ’ বলেছিল ঠিকই, কিন্তু মনটা ভীষণ ভারী হয়ে উঠেছিল ঋজুর। ভ্রূ কুঁচকে গিয়েছিল। অরূপদা হঠাত্‌ এ রকম কথা বললেন কেন! ( ক্রমশ )

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here