দশচক্র/ সমাপ্তি পর্ব// সিদ্ধার্থ সিংহ

0
776

দশচক্র/ সমাপ্তি পর্ব// সিদ্ধার্থ সিংহ

সাহিত্যিক সিদ্ধার্থ সিংহ 

                                                দশ

ঋজু বাড়ি ঢুকে দেখে বারান্দার গ্রিল ধরে ভারতী দাঁড়িয়ে আছে। এত বছর বিয়ে হয়েছে তার, ওকে কোনও দিন এই ভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেনি সে। তার খাবার, টেবিলে ঢাকা দেওয়া থাকে। অফিস থেকে ফিরে ও কাউকে ডাকাডাকি করে না। হাত-মুখ ধুয়ে, চুপচাপ খেয়ে নেয়। এঠোঁ বাসন রান্নাঘরের সিঙ্কে রেখে দেয়। কিন্তু আজ হঠাত্‌ এমন কী হল যে, রাত পৌনে একটার সময় তার বউ এই ভাবে দাঁড়িয়ে আছে। জুতো খুলতে খুলতে প্রশ্ন করল ঋজু, কী হল? শোওনি?

— না।

— কেন?

— শুলে যদি ঘুমিয়ে পড়ি! তোমাকে বলার জন্য দাঁড়িয়ে আছি।

— কী?

— ও ফোন করেছিল।

— কে?

— কণিকা।

— কণিকা! আকাশ থেকে পড়ল ঋজু।

বইমেলার ইউ বি আই অডিটোরিয়ামে যে দিন দীপ প্রকাশনের অতগুলি বই আনুষ্ঠানিক ভাবে প্রকাশিত হল, তার দু’দিন আগেই, কী কী বই বেরোচ্ছে, তার তালিকায় চোখ বোলাতে গিয়েই একটা নামে চোখ আটকে গিয়েছিল ঋজুর। এটা কী হল! ওর বইও বেরোচ্ছে নাকি!

ঠিক তখনই মনে পড়ে গেল, তার দু’রবিবার আগেই সুবোধ সরকার ওর কাছে কণিকার ফোন নম্বর চেয়েছিলেন। ও ভেবেছিল, অন্যান্য বারের মতো এ বারও বুঝি হয় ল্যান্ড ফোন, নয়তো বি এস এন এলের ব্রড ব্যান্ড নিয়ে ওঁদের কোনও সমস্যা হয়েছে, তাই ওর নম্বর চাইছে। ও দিয়েছিল। সে দিনই সুবোধ ওকে বলেছিলেন, ভাষানগর তো এ বার খুব বড় আকারে বেরোচ্ছে, দেখো না, যদি দু’-একটা বিজ্ঞাপন জোগাড় করতে পারো।

ভাষানগর একটি অনিয়মিত সাহিত্য পত্রিকা। সম্পাদনা করেন সুবোধ আর মল্লিকা। কিন্তু ঋজু বিজ্ঞাপন আনবে কোথা থেকে! ও ওর অপারগতার কথা জানিয়ে দিয়েছিল।

পরের রবিবার যখন গেল, সুবোধ বললেন, তোমার সঙ্গে কি কণিকার এখন যোগাযোগ আছে?

ও জিজ্ঞেস করেছিল, কেন সুবোধদা?

উনি বলেছিলেন, ও দুটো বিজ্ঞাপন এনে রেখেছে। যদি নিয়ে আসো। ওর অফিস তো তোমার অফিসের কাছেই। ঋজু বলেছিল, না, ওর সঙ্গে আমার এখন আর দেখাসাক্ষাত্‌ হয় না।

তালিকায় ওর নামটা দেখে ঋজু বুঝতে পারল, বিজ্ঞাপন জোগাড় করে দিয়ে সুবোধদাকে খুশি করে, সুবোধদাকে দিয়েই এই কাজটা ও করিয়েছে।

বই প্রকাশের দিন ঋজু একটু আগেই গিয়েছিল। অনুষ্ঠান শুরুর মুখে মঞ্চের লাগোয়া গেট দিয়ে কারা যেন ঢুকল। কারা! ঋজু তাকিয়ে দেখে, কণিকা, কণিকার দুই মেয়ে, মহাদেববাবু আর একজন কে যেন!

কে উনি ! কণিকা যার সঙ্গে গড়িয়াহাটে দেখা করতে গিয়েছিল কিংবা উল্টোডাঙার গলির ভিতরের এক রেস্তোরাঁয় যার সঙ্গে পর্দা ডাকা কেবিনে দীর্ঘক্ষণ কাটিয়েছিল, এ কি সে-ই! না। এ নিশ্চয়ই সে নয়! দীপঙ্কর তার যে বর্ণনা দিয়েছিল, তার সঙ্গে তো এর কোনও মিল নেই। পরে দীপঙ্কর ফলো করে করে আরও অনেক খবর এনেছিল। বলেছিল, লোকটার নাম অভিজিত্‌ শেঠ। থাকে যোধপুর পার্কের কাছাকাছি, রহিম ওস্তাগার লেনে। ওর বউ স্থানীয় একটা ছোট স্কুলে পড়ায়। ওদের একটা চার-পাঁচ বছরের ছেলেও আছে। তার ডাকনাম চকাই। আর ওদের সঙ্গে থাকে ওদের কাকা। তিনি বিয়ে থা করেননি। আশপাশের লোকেরা বলে, ওই কাকার সঙ্গেই নাকি অভিজিতের বউয়ের একটা অবৈধ সম্পর্ক আছে। ও কয়েক সপ্তাহ টেলিগ্রাফে ফ্রিল্যান্স করেছিল। এখন কী করে কেউ বলতে পারে না। সে যাই হোক, তা হলে এই লোকটি কে? লোকটাকে সোজা মঞ্চে নিয়ে গেল উদ্যোক্তাদের একজন। খানিক পরেই ঋজু বুঝতে পারল, লোকটার নাম আব্দুস সাত্তার।

ইনিই তিনি, যিনি কণিকার বই করে দেওয়ার জন্য শঙ্করদাকে অনুরোধ করেছিলেন!

কিন্তু কেন? অনুষ্ঠান শেষ হয়ে যাওয়ার পরে তাঁকে ঘিরে ছোট বাবি, বড় বাবি, মহাদেববাবু আর কণিকাকে ও ভাবে আদেখলাপনা করতে দেখে, ওর কাছে পুরো ব্যাপারটাই পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল।

হাঁটতে হাঁটতে বইমেলা প্রাঙ্গণেই দেখা হয়ে গিয়েছিল তথ্যকেন্দ্রের অরূপ সরকারের সঙ্গে। কথায় কথায় অরূপ বললেন, তোমার কণিকার খবর কী?

দু’-চার সেকেন্ড সময় নিয়ে ঋজু বলল, ভালই।

— হ্যাঁ, সে তো দেখলামই। আব্দুস সাত্তারের সঙ্গে ঘুরছে। তোমার কি দু’বছর হয়ে গেছে?

— কীসের?

— ওর সঙ্গে প্রেমের?

— দু’বছর। হ্যাঁ, তা তো হবেই। তার পর কী একটু ভেবে নিয়ে বলল, দু’বছরেরও বেশি।

— তা হলে আর আফসোস করে লাভ নেই।

— মানে!

— না, ও তো দু’বছরের বেশি কারও সঙ্গে মেশে না।

— কী বলছ?

— ওকে আমি ভাল করে চিনি।

— কই, তুমি তো আগে কখনও বলোনি।

— বললে, শুনতে? উল্টে ভাবতে আমি বুঝি ভাংচি দিচ্ছি। ও কত লোকের সঙ্গে মিশেছে তুমি জানো? ওর হয়তো নিজেরও মনে নেই। তালিকা করতে বসলে রাত কাবার হয়ে যাবে।

— তুমি তাদের কাউকে চেনো?

— দু’-তিন জনকে তো চিনিই। ওর আবার একটা হিসেব আছে। দেখবে, ও কখনও অবিবাহিত ছেলের সঙ্গে মেশে না। ও যাদের সঙ্গে মেশে তারা সবাই বিবাহিত।

— কেন?

— কারণ, হঠাত্‌ করে ও যদি কোনও মালদার পার্টি পেয়ে যায়, তখন যেটা আছে, সেটাকে তো কাটাতে হবে। সে যদি অবিবাহিত হয়, সে তো ঝামেলা করতে পারে। দুম করে কোনও একটা অঘটন ঘটিয়ে ফেলতে পারে। কিন্তু বিবাহিত হলে? এক মিনিটও লাগবে না। তার বউকে একটা ফোন করে দিলেই ল্যাঠা চুকে যাবে।

— তাই! না!

ঋজুর সব তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে। ওর যত দূর মনে পড়ল, দেখল, অরূপদা খুব একটা ভুল কিছু বলেননি। সত্যিই তো, কণিকা আজ পর্যন্ত যাঁদের সঙ্গে মিশেছে, তাঁরা সবাই বিবাহিত।

সে দিনই রাত্রিবেলায় কণিকা ফোন করেছিল ঋজুর মোবাইলে, তোমার সঙ্গে একটু দরকার ছিল, সময় হবে?

— কী দরকার? বলো।

— ফোনে বলা যাবে না। এলে বলব।

— কখন যাব?

— কাল তিনটে নাগাদ এসো। আমার অফিসে।

— ঠিক আছে।

পর দিন তিনটে নাগাদ ওদের অফিসের উল্টো দিকের ফুটপাথে, চায়ের দোকানে চা খেতে খেতে কণিকা যা বলল, কোনও মেয়ে যে তার পূর্ব প্রেমিককে এমন কথা বলতে পারে, ওর ধারণাই ছিল না।

কণিকা বলল, তোমাকে মিথ্যে বলব না। তুমি যার কথা বলেছিলে, ওই যে, গড়িয়াহাটে, উল্টোডাঙায়, যার সঙ্গে আমাকে দেখেছিলে, তার সঙ্গে সত্যিই আমার একটা সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। তার নাম অভিজিত্‌ শেঠ। যোধপুর পার্কে থাকে। ও যে দিন আমাকে প্রথম প্রোপোজ করল, আমি সে দিনই ওকে বলেছিলাম, আমার একজন স্ট্যান্ডিং লাভার আছে। কিন্তু তার পর থেকেই প্রত্যেক দিন ফোন করে ও এমন ভাবে কান্নাকাটি করতে লাগল, হঠাত্‌ করে খাওয়াদাওয়া বন্ধ করে দিল, আমাকে একটি বার দেখার জন্য আমার অফিসের গেটের উল্টো দিকের রাস্তায়, দিনের পর দিন ঝড়-জল-বৃষ্টির মধ্যে এমন ভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে লাগল যে, আমি আর ওকে না করতে পারলাম না। ছোট বাবি বড় বাবিও বলল, উনি যখন তোমাকে এত করে চাইছে, তাঁকে ফিরিয়ে দেওয়া তোমার ঠিক হবে না। খাবার টেবিলে বসে মহাদেববাবুও সব শুনলেন। কিছু বললেন না। ফলে…

মাঝপথে ওকে থামিয়ে দিয়ে ঋজু বলেছিল, এগুলো আমাকে বলছ কেন?

কণিকা বলেছিল, ছোট বাবি বলল, তোমাকে বলতে। তাই বলছি। আসলে হয়েছে কি, ওর একটা ছেলে আছে।

— জানি।

— বছর পাঁচেক বয়স।

— তাও জানি।

— এই কিছু দিন আগে ছেলেকে স্কুলে ভর্তি করাবে বলে আমার কাছ থেকে কিছু টাকা ধার নিয়েছিল। বলেছিল, দু’-তিন দিন পরেই দিয়ে দেবে। অথচ দু’মাসের ওপর হয়ে গেল…

— কত টাকা?

— দশ হাজার।

— ওর ফোন নম্বর নেই? ওকে ফোন করো।

— ফোন করলে ধরছে না। আমার নম্বর তো ওর মুখস্ত।

— অন্য কোনও নম্বর থেকে করো।

— তাও করেছিলাম।

— কী হল?

— ধরেছিল। যেই আমার গলা শুনেছে, অমনি বলল, আমি একটা কনফারেন্সে আছি। পরে করছি। কিন্তু আর করেনি।

— আবার করো।

— হ্যাঁ রে বাবা, করেছি। অন্য আর একটা নম্বর থেকে। আমার গলা যেই শুনছে, বলল, রাইটার্সে আছি। মুখ্যমন্ত্রীর ঘরে। পরে করছি।

— করেনি তো? আবার করতে।

— আমি কি করিনি? আবার দু’দিন পরে যখন করলাম, বলল, ব্যস্ত আছি।

ঋজু বলল, তা আমি কী করব?

— তুমি এক বার দেখো না… তোমার প্রেমিকাকে কেউ ঠকাবে, তুমি কি সেটা চাও?

ঋজু বলেছিল, দেখছি। আর মনে মনে বলেছিল, আমার কণিকাকে ভাগিয়ে নেওয়া, না? এ বার দেখাচ্ছি মজা।

ওর স্পষ্ট মনে আছে, অফিস থেকে নিয়ে কণিকাকে তাড়াতাড়ি বাড়ি পৌঁছে দিলেও, এই লোকটার ফোন না-আসা পর্যন্ত ও ফোনের কাছেই গ্যাট হয়ে বসে থাকত। হাত-মুখ পর্যন্ত ধুত না। শাড়ি পাল্টাত না। ফোন বাজলেই ঝাঁপিয়ে পড়ত।

ও কেন এ রকম করছে! থাকতে না পেরে ওর এক বন্ধুর কাছে ও একদিন কান্নায় ভেঙে পড়েছিল। সেই বন্ধুই ওকে বলেছিল, তুই কোনও জ্যোতিষীর কাছে যা। হাতটা দেখা। দরকার হলে পাথর-টাথর পর। আমার মনে হয় তাতেই কাজ হয়ে যাবে। কিংবা কোনও তান্ত্রিকের কাছে যা। অনেক সময় তুকতাক ফুঁকফাকেও খুব ভাল কাজ হয়।

— তান্ত্রিকের কাছে! আমি তো তেমন কোনও তান্ত্রিককে চিনি না। কী করি বল তো?

ও-ই বন্ধুই তখন তার চেনা এক তান্ত্রিকের নাম ঠিকানা দিয়ে দিয়েছিল। বলেছিল, একটা ফোন করে অ্যাপয়েন্টমেন্ট করে কালই গিয়ে এঁর সঙ্গে দেখা কর।

ও সেখানে গিয়েছিল। তাঁর সঙ্গে দেখাও করেছিল। এবং তাঁর কাছে জানতে চেয়েছিল, এ রকম কেন হচ্ছে?

সেই তান্ত্রিক সঙ্গে সঙ্গে ওকে বলেছিলেন, হবে না? ছেলেটা তো ওকে বশীকরণ করেছে রে… রাজবশীকরণ। ওটা কাটাতে গেলে তোকে যজ্ঞ করতে হবে। অনেক টাকার ব্যাপার। অত খরচা করতে পারবি?

ও বলেছিল, পারব। কিন্তু ও আবার আমার কাছে ফিরে আসবে তো?

তান্ত্রিক বলেছিলেন, আসবে রে, আসবে।

সে দিনও রিং হতেই ঝাঁপিয়ে পড়ে ফোন ধরতে গিয়েছিল কণিকা। কিন্তু তার আগেই প্রায় ছোঁ মেরে ফোনটা তুলে নিয়েছিল ঋজু। ‘হ্যালো’ বলতেই ও প্রান্ত থেকে একটা পুরুষ-কণ্ঠ ওর মা-বাবা, চোদ্দোপুরুষ তুলে, দু’অক্ষর, চার অক্ষর, ছ’অক্ষরের কাঁচা কাঁচা গালাগালি দিয়ে বলেছিল, ওখানে কী করছিস রে? বন্ধুর বউয়ের পেছনে ছুঁক ছুঁক করতে খুব ভাল লাগে, না? ও তোকে কাছেই ঘেঁষতে দেবে না, বুঝেছিস? অনেক দিন ধরেই তো চেষ্টা করছিস। কিছু পেয়েছিস? ও আমার।

গজগজ করতে লাগল ঋজু। আমার, না? এ বার দেখাচ্ছি মজা। তুকতাক? সব ঘুচে যাবে। জানবি, বাবারও বাবা আছে। এমনি এমনি ওই তান্ত্রিকের এত নাম হয়নি। বুঝেছিস?

অভিজিতের যে মোবাইল নম্বরটা কণিকা ওকে দিয়েছিল, সেটা সুইচ অফ। প্রথম দিন। দ্বিতীয় দিন। তৃতীয় দিন। ওকে ধরা গেল না। দিনে দু’-তিন বার ঋজুকে ফোন করে কণিকা জানতে চাইল, কী হল, ওকে পেলে?

তাই বাধ্য হয়ে ও খোঁজ করতে লাগল, ওকে কে চেনে! ওর বাড়ি যোধপুর পার্কেই হোক কিংবা রহিম ওস্তাগার লেনে, শুধু নাম দিয়ে তো আর বাড়ি খুঁজে বার করা যাবে না। ও যখন এই লাইনে আছে, ওকে খুঁজে পেতে খুব একটা অসুবিধে হবে না। ও ভাবতে লাগল, কে ওর বাড়ির ল্যান্ড ফোনের নম্বর দিতে পারে! একে ফোন করতে লাগল। তাকে ফোন করতে লাগল। ওকে ফোন করতে লাগল।

একজন বলল, অভিজিত্‌ শেঠ তো? খোঁচা খোঁচা চুল? তোমাদের টেলিগ্রাফে কাজ করত? ও তো রেনবো-তেও ছিল। তুমি তো অনেককেই চেনো। খাসখবরের কাউকে ফোন করে দেখো না…

ঋজু ফোন করল অমিতবিক্রম রানাকে। সেও খাসখবরে কাজ করত। ফোন করামাত্রই ঋজু বুঝতে পারল, ও ঠিক লোককেই ফোন করেছে। অমিত শুধু ওর ল্যান্ড নম্বরই দিল না, ওর বাড়িটা কোথায়, সেটাও একেবারে ছবির মতো বুঝিয়ে দিল। বলল ওর সম্পর্কে আরও অনেক কথাও।

অভিজিত্‌ বাড়িতে ছিল না। ওর বউ ফোন ধরেছিল। ঋজু তাকে নিজের মোবাইল নম্বর দিয়ে বলেছিল, ও এলে যেন আমাকে এই নম্বরে একটা ফোন করে।

কিন্তু ও আর ফোন করেনি।

পর দিন সকালে ফের ফোন করল ঋজু। অভিজিত্‌ই ধরল।

ঋজু বলল, আপনি কণিকার টাকাটা দিচ্ছেন না কেন?

— আপনি কে?

— আমি ওর বন্ধু, ঋজু বলছি।

— ঋজু! ও, আচ্ছা। ঢোক গিলল সে। তার পরে আমতা আমতা করে বলল, ও তো টাকাটা ফেরত চায়নি।

— ও আপনাকে বহু বার ফোন করেছে। আপনি নাকি ওর ফোন ধরছেনই না? ধরলেও ওর গলা শুনে নানা অজুহাত দেখিয়ে লাইন কেটে দিচ্ছেন?

— হ্যাঁ, দিচ্ছি। কারণ, যে মেয়ে জামাকাপড়ের মতো পুরুষ পাল্টায়, তার সঙ্গে যে-ই মিশুক, আমি মিশতে পারব না। আমার সঙ্গে ওর কী না হয়েছে। দিনের পর দিন অফিস কামাই করে ও আমার সঙ্গে আমার এক বন্ধুর ফাঁকা বাড়িতে গিয়ে সারা দুপুর কাটিয়েছে। একজন স্ত্রীর সঙ্গে একজন স্বামীর যা যা হয়, ওর সঙ্গে আমার সবই হয়েছে। আর যেই একজন মন্ত্রী পেয়ে গেছে, অমনি মুখ মুছে ফেলল…

— আপনি ওর টাকাটা কবে দিচ্ছেন?

— দেখুন, ও নিজে থেকেই টাকাটা আমাকে দিয়েছিল। কথায় কথায় ওকে একদিন বলে ফেলেছিলাম, এ মাসে খুব টানাটানি চলছে। ছেলেকে ভর্তি করাতেই প্রচুর টাকা লাগবে। এখনও সব টাকা জোগাড় হয়নি। একটা বড় অ্যামাউন্টের চেক পাব কাল। কিন্তু সে তো ক্যাশ হতে হতে আরও তিন-চার দিন… তখন ও জানতে চেয়েছিল, কত টাকা লাগবে? আমি বলেছিলাম, হাজার দশেক। পর দিনই ও আমার হাতে জোর করে একটা একশো টাকার বান্ডিল গুঁজে দিয়েছিল। আমি নিচ্ছিলাম না দেখে ও বলেছিল, আচ্ছা, তোমার জায়গায় যদি আমি হতাম, তুমি আমার পাশে এসে দাঁড়াতে না? তা হলে? তোমার ছেলে মানে তো আমারও ছেলে, না কি? আমি ওর জন্য এটা দিলাম। আমি বলেছিলাম, ঠিক আছে, নিচ্ছি। কিন্তু চেকটা ক্যাশ হলেই তোমাকে নিতে হবে। ও বলেছিল, তোমাকে ফেরত দিতে হবে না।

— এই কথা বলেছিল?

— ওকে জিজ্ঞেস করে দেখুন না… যে দিন এই কথা হয়, সে দিন আমাদের সঙ্গে ছকাই মকাইও ছিল।

— ছকাই মকাই!

— ওর মেয়ে।

— ওর মেয়েদের নাম ছকাই মকাই!

বেশ কিছুক্ষণ কথা বলতে পারেনি ঋজু। অদ্ভুত তো! অরূপদা অবশ্য এক বার বলেছিলেন, ও যখন যার সঙ্গে প্রেম করে, তার ছেলে বা মেয়ে, যে-ই থাকুক না কেন, একাধিক ছেলেমেয়ে থাকলেও, তার সব চেয়ে যে কাছের, তার নামের সঙ্গে মিলিয়ে কণিকা তার মেয়েদের একটা মনগড়া নাম তৈরি করে নেয়। অভিজিতের ছেলের নাম চকাই। তাই কি ও তার সঙ্গে মিলিয়ে ওর মেয়েদের নাম করে নিয়েছিল ছকাই মকাই! এর আগে ও যাঁর সঙ্গে মিশত, চলমান শিল্প আন্দোলনের অনুষ্ঠানে অভিজিত্‌ ঘোষ যাঁর কথা বলেছিলেন, সেই অপূর্বকুমার সরকারের মেয়ের নাম ছিল বুনু। তাই কি কণিকা তার সঙ্গে মিলিয়ে ওর মেয়েদের নাম তখন করে নিয়েছিল রুনু ঝুনু। ওর ছেলের নাম ‘বাবি’ শোনার পর, তার সঙ্গে মিলিয়ে তেমন জুতসই কোনও নাম খুঁজে না পেয়ে, কণিকা সম্ভবত তার মেয়েদের নাম রেখেছিল ছোট বাবি, বড় বাবি। ওর অফিসের ইউনিয়ানের সেক্রেটারি, কাঁচরাপাড়ার অরুণকুমার পাল বলেছিলেন, কণিকার মেয়েদের নাম টিনা-মিনা। তা হলে কি তাঁর মেয়ের নাম ছিল বীনা! চিনা! তৃণা! হতে পারে! কিন্তু এটা ও কেন করে! কেন! কেন! কেন!

আর ভাবতে পারছে না ঋজু। ও প্রান্ত থেকে অভিজিত্‌ শেঠ এতক্ষণ যে কী বলে যাচ্ছে, ওর কানে কিছুই ঢোকেনি। যখন সম্বিত ফিরল, ঋজু বলল, টাকাটা কবে দিচ্ছেন?

ও বলেছিল, দু’-চার দিনের মধ্যে। যত তাড়াতাড়ি পারি দিয়ে দেবো।

কণিকার তখন বাড়িতে থাকার কথা নয়, সে সময় অভিজিত্‌ একদিন কণিকার বাড়ি গিয়ে খামে ভরে দশ হাজার টাকা দিয়ে এসেছিল। ছোট বাবির হাতে। ছোট বাবি সঙ্গে সঙ্গে ফোন করে সে কথা জানিয়েও দিয়েছিল ওর মাকে। ওর মা-ও সেই মুহূর্তে ফোন করে ঋজুকে জানিয়ে দিয়েছিল সে কথা। বলেছিল, সত্যি, তুমি না থাকলে কিন্তু এই টাকাটা পেতাম না, পুরো মার যেত।

এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ফের ওদের মধ্যে পুরনো সম্পর্কটা দানা বেঁধে ওঠে। তবে না, আগের মতো অতটা মাখোমাখো নয়, তবুও অনেকটাই। কণিকা বলেছিল, আব্দুস সাত্তারকে দিয়ে অনেক কাজ হবে, জানো তো। আমি আর একটা নতুন স্কিম জমা দিয়েছি। ও তো বলল, পাশ করে দেবে। যদি দেয়, প্রচুর টাকার কাজ। তুমি আমাদের সঙ্গে থাকো না…

— উনি জানেন আমার কথা?

— না।

— তবে?

— তবে কী? যদি জিজ্ঞেস করে, বলব, আমার স্বামীর বন্ধু। আনন্দবাজারে কাজ করে। প্রচুর যোগাযোগ আছে। ও থাকলে আমাদের কাজ করতে অনেক সুবিধে হবে। এ সব নিয়ে তোমাকে ভাবতে হবে না। এটা আমার উপরে ছেড়ে দাও। তোমার কোনও আপত্তি নেই তো?

ঋজু বলেছিল, আছে। একসঙ্গে দু’জন থাকা যাবে না।

— একসঙ্গে মানে? আমি কি রোজ রোজ ওর কাছে যাই নাকি? সপ্তাহে একদিন কি দু’দিন। আমি তো তোমারই।

— তা হয় না।

— তা হলে আমাকে বিয়ে করে নাও।

— বিয়ে! দুম করে যে এ রকম কোনও প্রোপোজাল ও দিতে পারে, ঋজু তা কল্পনাও করতে পারেনি। বলেছিল, বিয়ে!

ঋজুকে আশ্চর্য হতে দেখে কণিকা বলেছিল, এমন করে বলছ, যেন ‘বিয়ে’ শব্দটা জীবনে এই প্রথম শুনলে!

— না, তা না। আমার তো বউ আছে!

— তাতে কী হয়েছে? ডিভোর্স করা যায় না?

— ডিভোর্স!

— হ্যাঁ, আমার কাছে ভাল উকিল আছে।

— সেটা না। মহাদেববাবু?

— ডিভোর্স করে দেবো।

— উনি ডিভোর্স দেবেন?

— আঃহা, সেটা তুমি আমার উপরে ছেড়ে দাও না… আগে বলো, তুমি কি তোমার বউকে ডিভোর্স করতে পারবে?

— না, মানে, বলছিলাম কি, আসলে, কী করে এই কথা বলব… ঋজু আমতা আমতা করছে দেখে কণিকা বলল, ও, বুঝেছি। তুমি বলতে পারবে না, তাই তো? ঠিক আছে, তোমার সঙ্গে মহাদেববাবুকে পাঠাচ্ছি। উনি তোমার মায়ের সঙ্গে, তোমার বউয়ের সঙ্গে, এ ছাড়াও এই ব্যাপারে আর যার যার সঙ্গে কথা বলার দরকার, উনি তাদের সবার সঙ্গেই কথা বলে আসবেন, তুমি রাজি?

— মহাদেববাবু! পায়ের তলা থেকে যেন মাটি সরে যাচ্ছে ঋজুর। মহাদেববাবু! তা হলে কি কণিকা একা নয়! তার সঙ্গে মহাদেববাবুও আছেন! সঙ্গে দুই মেয়েও! তবে কি এটা একটা চক্র! আমি সেই চক্রের মধ্যে পড়ে গেছি! ঋজু বিড়বিড় করে বলল, মহাদেববাবু!

— হ্যাঁ, মহাদেববাবু। তোমার অসুবিধে কোথায়?

— না, আসলে আমার বউকে আমি ডিভোর্স দিতে পারব না।

— কেন?

— আমার বউ ভীষণ ভাল।

— ও, তা, তোমার বউ যখন এত ভাল, তা হলে বাইরে প্রেম করতে এসেছ কেন? বউ জানে না?

— জানে, মানে আন্দাজ করে, ফিল করে…

— ও… তার মানে তোমার বউ জানে না। তাই বলো…

এর পর যে ক’বারই কথা হয়েছে, প্রতিটা কথাই ছিল কাট কাট। রসকষহীন। কেমন যেন কেঠো কেঠো। নিয়মরক্ষার। ‘কেমন আছ?’, ‘কী করছ?’, ‘ছোট বাবি কেমন আছে?’, ‘ভাল তো?’ এই রকম টুকটাক।

আজ অফিস থেকে বেরোবার সময়ও কথা হয়েছে। কিন্তু কণিকা হঠাত্‌ এত রাতে ওর বাড়ির ল্যান্ড লাইনে ফোন করতে গেল কেন! ও তো ওর মোবাইল নম্বর জানে। সেখানেও করতে পারত!

ঋজু যখন খেতে বসেছে, ভারতী খাটের উপর চিত্‌ হয়ে শুয়ে সিলিংয়ের দিকে ঠায় তাকিয়ে আছে। হঠাত্‌ ক্রিং ক্রিং ক্রিং ক্রিং— ঋজু এসেছে? ওকে দাও তো।

ভারতী বলল, ও খাচ্ছে।

কণিকা বলল, ওকে বলো, আমি ফোন করেছি।

ভারতী ফোনের মুখ হাতের তালু দিয়ে চেপে ঋজুর দিকে তাকিয়ে বলল, তোমার ফোন।

— কে?

— কণিকা।

ঋজু খেতে খেতেই বাঁ হাত দিয়ে কর্ডলেস ফোনটা ধরল, কী হয়েছে?

ও প্রান্ত থেকে কণিকার কান্না-ভেজা গলা— আমার একদম ঘুম আসছে না।

— অ্যালজোলাম নেই?

— আছে। দুটো খেয়েছি। তাও ঘুম আসছে না। তুমি আমাকে ঘুম পারিয়ে দিয়ে যাও।

— এখন!

— আমি জানি না। তোমাকে আসতেই হবে।

— একটা বেজে গেছে! কোনও গাড়িটারি তো পাব না। যাব কী করে?

— আমি কোনও কথা শুনতে চাই না। তোমাকে আসতেই হবে। লক্ষ্মী সোনা আমার…

ঋজু যখন ফোনে কথা বলছে, ভারতী ওর একদম পাশে এসে দাঁড়ল। জিজ্ঞেস করল, কী হয়েছে?

— কণিকা ফোন করেছিল।

— সে তো জানি। কী বলছে?

— বলছে, ঘুম আসছে না। আমাকে ঘুম পারিয়ে দিয়ে যাও।

— যাও।

ঝট করে ভারতীর দিকে তাকাল ঋজু। যাব?

— বললাম তো, যাও।

— কিন্তু যাব কী করে? এত রাতে… সল্টলেকে কোনও ট্যাক্সিও যেতে চায় না।

— দশ-বিশ টাকা বেশি দিলেই যাবে।

— আরে, ট্যাক্সি পেলে তো…

— শ্মশানের কাছে চলে যাও, ওখানে সারা রাত লাইন দিয়ে ট্যাক্সি দাঁড়িয়ে থাকে। পেয়ে যাবে।

— হ্যাঁ হ্যাঁ, ঠিক বলেছ। তা হলে গিয়ে দেখি… বলেই, যে-জামাপ্যান্ট পরে ও অফিসে গিয়েছিল, সেগুলিই পরতে যাচ্ছিল, ভারতী বলল, ওগুলো তো ময়লা। থাক। আমি বার করে দিচ্ছি। বলেই, ওয়ারড্রপ থেকে চোস্তা আর পাঞ্জাবি বার করে দিল। হাতে তুলে দিল পাউডার-কেস, চিরুনি, রুমাল।

বেরোবার আগে ঋজু যখন পার্স দেখছে, ভারতী বলল, এই নাও, এটা রাখো।

ও দেখল, তিনটে একশো টাকার নোট ওর দিকে বাড়িয়ে দিয়েছে ওর বউ। ঋজু বলল, তোমার কাছে ছিল?

— আমার কাছে কোত্থেকে থাকবে?

— তা হলে এটা?

— সংসারের টাকা।

— অসুবিধে হবে না?

— ও আমি ঠিক চালিয়ে নেব।

টাকাটা নিয়ে ঋজু বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ল। হাঁটা দিল কেওড়াতলা শ্মশানের দিকে।

ফাঁকা রাস্তা। ফুল স্পিডে ট্যাক্সি ছুটছে। যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গণের পাশ দিয়ে যাবার সময়, ঋজুর হঠাত্‌ মনে হল, আমি কি এটা ঠিক করছি! অন্য কোনও বউ হলে তো এতক্ষণে বাড়িটাকে একটা রণক্ষেত্র বানিয়ে ছাড়ত। সেখানে ভারতী! নাঃ, এটা ঠিক হচ্ছে না। এই চক্রব্যুহ থেকে আমাকে বেরোতেই হবে। হায়াতের দিকে যখন ট্যাক্সিটা টার্ন নিচ্ছে, পেছন থেকে ড্রাইভারের পিঠে টোকা মেরে ঋজু বলল, দাঁড়ান। ব্যাক করুন। আমি চেতলায় যাব।

ড্রাইভার গাড়ি দাঁড় করিয়ে পিছন ফিরে জিজ্ঞেস করল, কিছু ফেলে এসেছেন?

ঋজু বলল, হ্যাঁ, আমার সব কিছু।

ট্যাক্সি যখন বিজন সেতু টপকাচ্ছে, জানালা দিয়ে আসা হুহু করা বাতাসে শরীর জুড়িয়ে এল ঋজুর। আঃ, কী শান্তি! কী শান্তি!  হঠাত্‌ বিড়বিড় করে ও বলে উঠল, এ আমি কোথায় যাচ্ছিলাম! কোথায়! ছিঃ। আমার বাড়ি তো সাতাশের এ, আলিপুর রোডে।

গাড়ি তখন রুদ্ধশ্বাসে রাসবিহারী ছাড়িয়ে, কেওড়াতলা ব্রিজ টপকে চেতলার দিকে ছুটছে। ( সমাপ্ত)

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here