অবকাশে-র ভগীরথ জননী সংখ্যার একমাত্র ছোটগল্প আরাধনা পড়ুন লিখেছেন অর্পিতা গোস্বামী চৌধুরী

0
742
ছবি সৌজন্যে ইন্টারনেট

অবকাশে-র ভগীরথ জননী সংখ্যার  ছোটগল্প আরাধনা পড়ুন লিখেছেন অর্পিতা গোস্বামী চৌধুরী

মেয়ে দুটি খেলছিল রাজপ্রাসাদের প্রাঙ্গনে। বয়স কত হবে, এগারো বারো! পরনে সাদা রেশমি কাপড়  আর রূপালী কাঁচুলি।  গয়না তেমন নেই। গলায় একটা করে সোনার মালা, হাতে মানতাসা।      খোলা চুলগূলো যেন সদ্য পলু গুটি থেকে ছাড়িয়ে আনা রেশম। ওরা আলুলায়িত চুল সাজিয়ে নিচ্ছিল জারুল ফুলে। পূব আকাশে মেঘ জমেছে। পাখিদের কলকাকুলিতে মুখরিত বিকেল। সবমিলিয়ে সুন্দর একটি দিন। তবে ওদের মনে কিসের বিষাদ ! সরল হাসিতে মিশে আছে কোন সে আঁধার !  লাগোয়া প্রাসাদের বারান্দায় এসে দাঁড়াল রাজ পুরোহিত রুদ্র ভানু। বিকেলের হাওয়ায় পতপত করে উড়ছে ওর সাদা চুল আর সাদা উত্তরীয়। দেখলেই কেমন ভয়ে গা হীম হয়ে যায় দুই বালিকার। রেবতী আর বাসবি। দুজনেই রুদ্র ভানুকে দেখে সঙ্কুচিত ।  চোখ থেকে যেন আগুন ঝরে!  হাত ধরাধরি করে ওরা প্রাসাদের অন্দর কক্ষে ঢুকে পরল । কিছুক্ষন কেউ কোন কথা বলল না।

বিপন্নতা দুজনকে আজ যত কাছাকাছি নিয়ে এসেছে চিরকাল তেমন ছিলনা । মহারাজ দীলিপ বেঁচে থাকতে রেবতী সহ্য করতে পারতো না সতীন বাসবিকে।  বাসবির ভেতরে ক্ষোভ থাকলেও মুখে প্রকাশ করার সাহস ছিল না। সে নতুন। তার উপর ছিল অন্যের অধিকারে ভাগ বসাবার পাপ বোধ। অন্তর মহলের সমস্ত দায়িত্ব তখন রেবতীর অধীনে। সেই সুখের দিন আর নেই। সন্তানহীনা বিধবা রমণী, কি তার গর্ব আর কি বা অধিকার।  রাজমাতা সত্যপ্রভা রাজ অভিভাবক রুদ্রভানুকে সিংহাসন দেখাশোনার ভার দিলেন। কেউ আর আগের মতো দুই রানীকে মান্য করে না। ধীরে ধীরে কোথায় যে তলিয়ে যাচ্ছিল। সবচাইতে আশ্চর্য ঘটনা সেদিন ঘটল যখন এক সাধারন সেনাপতি রেবতীর ঘরে বিনা অনুমতিতে ঢুকে পরল আর অত্যন্ত বিচ্ছিরি ভাবে কথা বলছিল ওর সঙ্গে। রাজমাতা মন্দিরে। রক্ষীরা যে যার ইচ্ছামত সময় কাটাচ্ছে। কেউ জুয়া খেলছে কেউ প্রেয়সীর সাথে। রেবতী ঠিক আগের মতই দর্পে বলল, আদেশ করছি চলে যাও এখান থেকে কিন্তু নিতান্ত বালিকা রানীর কথা গ্রাহ্যই করল না সেই শয়তান।  অসহায় রেবতী আর কিছুই করনীয় স্থির করতে পারছিল না। আতঙ্কে তার কান্না পেয়ে গেল। অজগরের মত ওকে গিলে খেতে এগিয়ে আসছিল সাক্ষাৎ কলঙ্ক।  রেবতী চোখ বন্ধ করে ফেলল। ঠিক সেই সময় একটা বজ্রঘন শব্দ ওর চেতনা ফিরিয়ে দিল। তাকিয়ে দেখল সেনাপতির মুন্ডুহীন দেহ দাঁড়িয়ে আছে। যুদ্ধের মুদ্রায় বাসবির হাতে সোনার তলোয়ার রক্তাক্ত। মাত্র কিছুক্ষনেই ধপ করে দেহটিও পরে গেল। অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিল রেবতী ওর দিকে। মুখে ছিটিয়ে পরা রক্ত চোখের জলে ধুয়ে যেতে শুরু করল। চোখের জল সংক্রামিত করল বাসবিকেও। কোথায় থেকে কিসের এত কান্না এল কে জানে!  ওরা পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে চলল অবিরাম। সেই প্রকাশিত একাকিত্ব একটু একটু করে গড়ে তুলেছিল নির্ভরতার মিনার। ওরা একসঙ্গে এখন গান গায়, ফুল তোলে দীঘিতে স্নান করে পূজা করে। ওদের পায়ের তালে তালে দুলে ওঠে গাছের ফুল, পথের ধুলো এমনকি প্রদীপ শিখা ধুপের ধোঁয়াও।

বাসবি অবাক হয়ে দেখে রেবতী কেমন সুন্দর গৃহিণী।  কি রান্না হবে,  ভাড়ার ঘরে কি নেই অথবা দাস দাসিদের অভাব অভিযোগ,  সুবিধা অসুবিধা সব দিকে তার নজর তীক্ষ্ণ।  আবার রেবতী ভাবে বাসবি না থাকলে এই অরাজক সংসারে বেঁচে থাকাই দুরূহ হত। সমস্ত রাজ্যে না হলেও অন্তত এই প্রাসাদের শৃঙ্খলা রক্ষা করে বাসবি। এমনকি কে কে মিথ্যাচারী আর কে অর্থ তছরুপ করছে সবদিকে তার সতর্ক শাসন। দিন চলে যায়। কৈশোর থেকে যৌবন।  এক আত্মা দুই শরীর।  সতীন এর সম্পর্ক পালটে যায় দুই বোনের সম্পর্কে। পারস্পরিক নির্ভরশীলতা মন থেকে শরীর, শরীর থেকে কৌতুহল,  কৌতুহল থেকে কৌতুক চাহিদা সমস্ত একাকার।

রুদ্রভানু বয়স্ক হচ্ছে। রাজমাতা চিন্তিত উত্তরাধিকার নিয়ে। আলোচনায় বসলেন তারা অত্যন্ত গোপনে ক্ষেত্রজ সন্তানের প্রথা সম্পর্কে। এ অত্যন্ত গোপন প্রকৃয়া। আদেশ করা হল দুই রাজ রমণীকে। ভয়ে লজ্জায় ওদের মুখ শুকিয়ে গেল। কিন্তু কর্তব্যের দোহাই বড় বালাই। উপেক্ষা করবে এমন সংস্কার ওরা পায়নি। তা ছাড়া উত্তরাধিকার একটা বড় প্রশ্নচিহ্ন।  তবু বাসবি বলার চেষ্টা করল, অন্য উপায়—–। রুদ্রভানু গর্জে উঠল, স্বৈরচারী সমকামী  গুরুজনের অবমাননা!  ঈস্বরের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কথা।শাপ দিচ্ছি——। ঠক্ ঠক্ করে কাঁপছিল রেবতী। রাজমাতা ত্রস্ত হয়ে পুরোহিতের পায়ে গিয়ে পরল। — ক্ষমা ক্ষমা করুন মহাত্মা, ওরা অবুঝ।

তিনদিন থেকে উপোস করেছিল দুই অসহায় রাজবধু। বশিষ্ঠ মুনি এসেছেন। বেদযজ্ঞ চলছে মহা সমারোহে।  তৃতীয়দিনে আজ ব্রত উজ্জ্বাপন। নিদ্রাহীন দুই রমণী কে সাজান হয়েছে অর্ঘের মত। রক্ত লাল বসন, ফুলের গয়না,  চন্দনের প্রলেপ।  ধুপ ধুনোয় মন্দির প্রাঙ্গন যেন ঘোরের জগৎ। লিঙ্গ অভিষেক চলছে তিনদিন ধরে। দুধ মধু ঘি দই আরও কত কি। হর হর মহাদেব। সমস্ত রাজ্য থেকে জনগণ এসে ভীড় জমিয়েছে। মহাদেব স্বয়ং আবির্ভূত হবেন। আশীর্বাদ দেবেন দুই কুমারী বিধবাকে। সিদ্ধির নেশায় আচ্ছন্ন দুই বধু। রুদ্রভানু ওদের ঘরে ঢুকল। এটাই আশা করছিল রেবতী আর বাসবি। রেবতী কাঁদতে শুরু করল।  বাসবি সিদ্ধি সেবিত রক্ত চোখে ভাল করে যেন বুঝতেই পারছে না কিছু।  পুরোহিত হো হো করে হাসছে দু’জনের অসহায়তায়। ওরা ঠিক করে দাঁড়াতেও পারছে না। ভয়ে কুন্ঠায় ভেজা পাখির মত টলমল। রেবতীর বস্ত্র কেড়ে নিল নৃশংস বৃদ্ধ, তারপর বাসবির। আজ তার ইচ্ছামত শাসনের দিন। উৎফুল্লতার চরমে রুদ্রভানু আর অপমানের শেষ সোপানে সূর্য বংশের মহারাজ দিলীপ এর দুই রানী।

রেবতীর রক্ত বস্ত্র মাটিতে লুটাচ্ছে,  সিদ্ধির নেশায় বলহীন যুবতী ঢুলু ঢুলু চোখে জল আর অসহায়তা। বাসবি তবু হারবে না। মাটিতে লুটিয়ে পরেছে ওর বস্ত্রখন্ডও। তবু যেটুকু গায়ে আছে সেটা যেন সাক্ষাৎ আগুনের রূপ ধরেছে। আঁচরে কামরে ক্ষতবিক্ষত করে দিয়েছে রুদ্রভানুকে। সিদ্ধির নেশায় ভুলে গিয়েছে আদেশ উদ্দেশ্য সব। রুদ্রভানু যত ওকে বসে করার চেষ্টা করছে ও ততই প্রতিরোধ গড়ে তুলছে। বাইরে জোরে জোরে ঢাকের আওয়াজ, কাঁসর ঘন্টা। জনতা সমবেত আরাধনায় উল্লাসে চিৎকার করছে হর হর মহাদেব। অথচ কেউ জানেনা এই সাম্রাজ্য এই প্রাসাদের মান অভিমান কি করুন দমনের সম্মুখীন।  প্রবল প্রতাপী রুদ্রভানুর থাবার আয়ত্তে বাসবি।  বাইরে মুখরিত স্তোত্র। বস্ত্র-হীন খোলা চুল সিদ্ধি পানে লাল চোখ রেবতী হাতে হঠাৎ একটা ত্রিশূল পেয়ে সোজা উঠে দাঁড়িয়েছে যেন স্বয়ং মা কালী।  মুহুর্তে সেই ত্রিশূল এপার ওপার করে দেয় রুদ্রভানুর হৃৎপিন্ড। কিছুক্ষণ স্তম্ভিত দাঁড়িয়ে থাকে ওরা তারপর  আস্তে আস্তে স্বাভাবিক হয়। কি হল, কি করনীয় কিছুই স্থির করতে পারছিলনা । হঠাৎ খেয়াল হল ত্রিশূলটা এল কোথায় থেকে! দাঁড়িয়ে রয়েছে শান্ত সৌম্য দৃপ্ত এক প্রৌঢ়, মহর্ষি বশিষ্ঠ।  সমস্ত মুখমণ্ডলে ছড়ান এক পবিত্র হাসি। হাতে একটি শিশু। দূরদর্শীতা তাকে এই ভূমিকায় অবতীর্ণ করেছে। সঙ্গে রাজ মাতাও দাঁড়িয়ে। বশিষ্ঠমুনির কথায় সে তার ভূল বুঝতে পেরেছে। শিশুটিকে দুই ভগিনীর কোলে তুলে দিলেন মহামুনি।  নাম দিলেন ভগীরথ। বললেন শিব আরাধনার ফল, আশ্রমিক  এই শিশুকে  মাতৃ স্নেহ দেবে না! এই নাও, এ হবে সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকারী।  জ্ঞানে বিচক্ষনতায় হবে অতুল্য।  রাজমাতা ক্ষমা চাইবার ভাষা খুঁজে পাচ্ছিলেন না। তিনি সকলকে নিয়ে প্রজাদের সম্মুখে উপস্থিত হলেন। জয়ধ্বনিতে আকাশ বাতাস ছেয়ে গেল। রেবতী বাসবি পরস্পরকে জড়িয়ে ধরল পরম আদরে নির্ভরতায়। যেন কত কত দিন পর এক খন্ড মেঘ ভেসে এসেছে রৌদ্রদগ্ধ ভূখণ্ডর উপর। আনন্দের হাওয়ায় মাতোয়ারা আকাশ বাতাস,  মাথা দুলিয়ে মাতোয়ারা গাছ। আনন্দাশ্রু হয়ে নেমে এল বৃষ্টি তুমুল ধারায় ঝম ঝম করে।

*** লেখার সঙ্গে দেওয়া ছবিতে সাহিত্যিক অর্পিতা চৌধুরী গোস্বামী এবং অন্য ছবিটি গুগুলের  সৌজন্যে পাওয়া

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here