দেহনাট্যম //অবকাশে সঞ্জয়

0
210

এক অনন্য নৃত্যধারা সম্পর্কিত ভিন্ন স্বাদের ছোটগল্প

লেখক

দেহনাট্যম

অবকাশে সঞ্জয়

এই হল দেহনাট্যম। এ যে কী নৃত্য,না দেখলে বিশ্বাস হয় না। উফ! কিছুতেই ভুলতে পারছি না! যেদিকেই তাকাচ্ছি শুধু ছায়াছন্ন সেই নৃত্যছবি। একেই বলে বোধহয় স্বপ্নযাপন। সবকিছুই স্বপ্নময় লাগছে।

তাহলে প্রথম থেকেই বলি।  নাচ আমার বরাবর ভাল লাগে। সুযোগ পেলেই দেখি। সেরকমই এক নাচের অনুষ্ঠানে ওকে প্রথম দেখা। দেখতে দেখতে ভাললাগাটা ভালবাসায় রূপ নিল। মানে আগে সময় পেলে নাচ দেখতাম। এখন নাচ দেখার জন্য সময় বের করে নিই। আর তা  শুধু ওর নাচ দেখার জন্য। মুদ্রা তাল আঙ্গিক এক্সপ্রেশান সবকিছু দিয়ে মঞ্চে এমন  নৃত্যছবি তৈরী করে  চোখের পলক পরে না আমার। প্রত্যেক অনুষ্ঠানে একেবারে সামনের সারির সিটে আমাকে দর্শক হিসেবে দেখতে দেখতে ওরও আমাকে ভাল লেগে গেল। একদিন গ্রীনরুমে ডেকে পাঠাল। আমি যেতেই কোন আলাপ পরিচয়ের প্রসংগে না গিয়ে সরাসরি প্রশ্ন, আমার নাচে কি এমন আছে যে প্রত্যেকটা অনুষ্ঠান দেখতে ছুটে আসেন?

– জানি না। তবে না এসে থাকতে পারি না ।

-তাই ?

– হুম ।

সেই শুরু । তারপর ফোন নাম্বার দেয়া নেয়া । কিন্তু কথা হত না । ফেসবুক হোয়াটসঅ্যাপেও পেতাম না ।  কোথায় যেন লুকিয়ে থাকতো । ওই দূর আকাশের তারার মতো । কিন্তু ঠিক দিনে ঠিক সময়ে মঞ্চাকাশে জ্বলজ্বল করে ভেসে উঠত ।

কতবার বলেছি , কি গো নাচ ছাড়া অন্যসময়ে তোমাকে দেখতে পাব না ?

-নাঃ । বলেই মন ভাল করা হাসি উপহার দিয়েই উধাও ।

এভাবেই দিন ফুরোচ্ছিল । রাত ঘুমোচ্ছিল । ফুল ফুটছিল । ঝরেও যাচ্ছিল । আমিও নিজের সংগে থাকতে থাকতে সবকিছুই মেনে নিচ্ছিলাম ।

হঠাৎ একদিন । সক্কালবেলা ওর মেসেজ । দিনটা ছিল ওর জন্মদিন । জানতাম দেখা হবে না । তাই  ফোনেই উইশ করতে গেলাম । কিন্তু আমাকে অবাক করে আমার বাড়ীর ঠিকানা চাইল । কারণটা বুঝতে পারলাম না । জিজ্ঞেস করলে তো  বলবে না । তাই কৌতূহল চেপে রখে ওর ইচ্ছে মেনে  অ্যাড্রেস আর রুটগাইড দিলাম ।

কী আশ্চর্য ! ও  এসেছে ! আমার বাড়ি ! কিছুতেই যেন বিশ্বাস হচ্ছিল না । মনে হচ্ছিল যেন স্বপ্ন দেখছি । তবে স্বপ্নেও বোধহয় ওকে এমনভাবে  দেখতে পেতাম না ।  সে কি সাজ ! কল্পসুন্দরীর মতো ! পরণে বাসন্তী রঙের শাড়ী । খোঁপায় পলাশের  মালা । কানে ঝুমকোফুলের দুল । নাকে আকন্দের  নাকছাবি । আর হাতের আঙুলে জুঁইফুলের আংটি । কপালে গোধূলির সূর্য । ঠোঁট লালগোলাপের পাপড়ি । কী ভালই না লাগছিল । চোখ ফেরাতে পারছিলাম না । এই প্রথম ওকে ছোঁয়ার ইচ্ছে হল । তবে  মুখে কিছু বললাম না । চুপচাপ  সাদর অভর্থ্যনা দিয়ে ভিতরে নিয়ে গেলাম । বসালাম বিছানায়। তারপর  হাঁটু গেড়ে ওর পায়ের কাছে বসলাম ।

আমাকে এভাবে বসতে দেখে ও বলল , এ কি ! এভাবে নীচে বসলে যে ! আমার পাশে এসে বোসো । আমি ওর সেকথায় কান না দিয়ে  বলে উঠি ,  চোখ বোজ ।

  • কি ! ও বোধহয় আমার কথাটা বুঝতে পারে নি । তাই আবার বললাম , বলছি দুচোখ বন্ধ করে চুপটি করে একটু বোসো তো ।
  • সে কি কেন ?
  • আঃ ! বোজোই না ।
  • বেশ । কিন্তু তাড়াতাড়ি ।

– উফ ! শুধু প্রশ্ন করে ! একটু চুপ করে বোসো না গো ।

– আচ্ছা ঠিক আছে নাও । আমি নিজেকে সমর্পন করলাম তোমার হাতে ।

ও কি সব  বুঝতে পারল ? কি জানি ! মেয়েদের তৃতীয় নয়ন নাকি খুব প্রখর ! যাক গে । আমি ঠিক করে নিয়েছি আজ আমার  ইচ্ছেপূরন করবই । ওর কোন ওজর-আপত্তি শুনবো না । আর তাই তাকালাম ওর পায়ের দিকে। আমি মনে মনে যার নাম দিয়েছি ঘুঙুরপাদিকা । ঘুঙুরফুলে সাজানিয়া সেই পা দুটি এই প্রথম আমি ফাঁকা দেখছি । সে কথা ওকে বলতে বলতে , আমার পাঞ্জাবীর পকেট থেকে এক জোড়া ঘুঙুর বের করে পরিয়ে দিলাম ওর দুপায়ে । ও বোধহয় কিছু বলতে যাচ্ছিল…আমি ওর ঠোঁটে তর্জনী রেখে চুপ করালাম । তারপর আস্তে আস্তে ঠোঁট রাখলাম ওর ডানপায়ের পাতায় । আমার প্রথম চুম্বন ওকে । হ্যাপি বার্থ ডে টু হিয়া ।

  • এ কি করলে তুমি ! তোমার স্থান আমার বুকে ! সেখানে তুমি কিনা আমার দুপায়ের গহনা দিলে…এ আমি পরব না ।

আমি সে কথায় কান না দিয়ে  এক এক করে ওর পায়ের আঙুলগুলোয় আলতো কামড় দিচ্ছি আর বলে চলেছি,তোমার পায়ের প্রথম আঙুল বেশি ভার সহ্য করে সংসারের বৃদ্ধদের মতো । তাই এর নাম দিলাম বৃদ্ধপদঙ্গুষ্ঠা । দ্বিতীয় আঙুলে আঙোট পরেছ  ; এর নাম রাখলাম আঙুরানি । মাঝের আঙুল তো পায়ের পরমাসুন্দরী । তাই ওর নাম পদ্যমা । এর পরের আঙুল আরও প্রিয় । ভালোবাসার রিং পরেছ এখানে । এর নাম পদানিকা । আর ছোট্ট আঙুলটাকে ডাকব আদুরিকা নামে । কি গো পছন্দ হয়েছে ?

জানার জন্য মুখের দিকে তাকাতেই দেখি , ওর দুচোখ ভরা জল । আমি মোছার জন্য হাত বাড়াতেই ও জড়িয়ে ধরল,  এ তোমার কেমন আদর! সারা শরীরে কোথাও কোন শিহরন নেই । শুধু ভিতরে ঘুঙুর বেজে চলেছে ।

  • তাই !
  • হুম । জয় , আজ আমাকে যে সুখ দিলে এর বিনিময়ে আমি কি দিই বলো তো !
  • ধ্যাত , এ আবার কেমন কথা ! ভালোবাসা কি বিনিময়ে বাঁচে ! আমার আজ যা করেছে তাই করেছি । তোমার কিছু ইচ্ছে করলে কোরো ।
  • বেশ , তবে আজ না । অন্য কোন একদিন । বলেই ও উঠে দাঁড়ালো ।

আমার মন রাঙানিয়া হিয়াকে তখন মনে হচ্ছিল সদ্য ফোটা ফুল ! পাপড়িতে লেগে আছে শিশিরবিন্দু । জানলা দিয়ে আসা আলো পড়ে মুক্তোর মতো ঝকঝক করছে ।

সেদিনের পর । হিয়া আর এল না । ফোনও সুইচ অফ । কোনভাবে যোগাযোগ করতে না পেরে একদিন ওর বাড়ী গেলাম । এর আগেও বেশ কয়েকবার গিয়েছি । ওর মায়ের সঙ্গে আলাপও ছিল আগে থেকে । তাই কোন অসুবিধা হল না । গিয়েই পড়লাম বিপদে ।

  • এ কি ! জয় , তুমি ! হিয়া তো বাড়ী নেই । এক বন্ধুর বাড়ী গিয়েছে । তোমায় বলে নি ? ওর মায়ের প্রশ্নবাণ ধেয়ে আসতে লাগল আমার দিকে ।
  • না , বলেছিল । আমি ভুলে গেছিলাম । স্যরি । আসলে এই বইটা ওকে দেওয়ার ছিল । বলেই ব্যাগ থেকে কদিন আগে কলেজস্ট্রিট থেকে কেনা গল্পের বইটা বের করে কোনরকমে সামাল দিলাম ।
  • ওঃ । তাতে কী হয়েছে । এস ভিতরে এস । এককাপ চা খেয়ে যাবে ।
  • আজ থাক মাসীমা । আমার একটু তাড়া আছে ।

বইটা ওনার হাতে দিয়েই হনহন করে বেরিয়ে এলাম । বাসস্টপে দাঁড়িয়ে ভাবছি , কোথায় যাওয়া যায় । ঠিক তখনই চোখে পড়ল , হিয়া অটো থেকে নামছে । আমি হাসিমুখে এগোতে যাব হুস করে একটা বাস ছুটে এসে আড়াল করে দাঁড়াল । বাসের আড়াল সরে যেতেই দেখি , হিয়া উধাও ।

এবার খটকা লাগল । ও কি  ইচ্ছে করেই এমন করছে ।  আমাকে অ্যাভয়েড করে তাই বোঝাতে চাইল কি ! শেষ দেখায় বলেছিল , ও আমাকে কিছু দিতে চায় । সেটা কি ? ভালবাসার যন্ত্রনা ! হঠাৎ দেখি আমার অজান্তে আমার ডানহাতটা  কখন আমার  বুকে উঠে এসেছে । আর কী আশ্চর্য !  বুকটা সত্যি সত্যি  ব্যাথা ব্যাথা লাগছে ! দুচোখেও জ্বালা ! বুঝলাম , ভালবাসলে বড্ড কষ্ট পেতে হয় । কিন্তু কেন ? জানতে হলে তো …

ওর বাড়িতে আবার যাব ? এবার তো দেখা করতে বাধ্য হবে । নাঃ থাক  ! ভালবাসার জন্য আমার এই কাঙালপনা ভাল ! কিন্তু সেই কাঙালপনাকে ও যদি অপমান করে সে আমার সইবে না । তাই যা পেয়েছি সেটুকু নিয়েই ফেরা যাক । পরক্ষনেই মনে হল , আমার ব্যাথার খানিকটা ওকে দিয়ে এলে কেমন হয় ! ওর মুখের হাসি নিশ্চয় তখন মিলিয়ে যেত । ছিঃ ! ছিঃ ! এ আমি কি ভাবছি ? ও নাই বাসুক , আমি তো ওকে ভালবাসি । ও মাসের পর মাস আমাকে অ্যাভয়েড করলেও আমি  অপেক্ষায় থাকব ।আর একবার ডাক দিলেই ছুটে যাব ।

সেই ডাক এল । তিনমাস পর । কী আশ্চর্য ! ভিতরের ছটপটানি এতদিনে এতটুকু কমে নি । বরং বেড়েছে । অভিমানের সঙ্গে লড়াইয়ে অনায়াসে জিতেও গেল দেখা করার ইচ্ছে ! বুঝলাম , ভালবাসা এমনই হয় । তার অভিমান থাকে কিন্তু  মান অপমান বোধ থাকে না !এই সত্যটুকু আবিষ্কার হতেই আমার অহং বিদ্রোহ করে বসল । তবে তাকে একটু বুঝিয়ে সুজিয়ে বলতেই রাজী হয়ে গেল ।

হিয়া মেসেজে সন্ধ্যায় ওদের বাড়ীতে যেতে লিখেছে । কেন ? সেসব কিছু লেখে নি । জিজ্ঞেস করার প্রশ্নই ওঠে না । ভালবাসা ডাক দিয়েছে , সেটাই তো শেষ কথা ।

শুরু হল প্রতীক্ষা । গত তিনমাসে যা হয় নি আজ তাই হচ্ছে । বুকের ধুকপুকানি বেড়ে গেছে । ও আর আমার আছে তো ? নিজেকে এই প্রথম এত অসহায় মনে হল ।

অফিসে আজ দীর্ঘতম দিন কাটাচ্ছি । ঘড়ির কাঁটার গতি কমে গেছে । সূর্য ডুব দিতে ভুলে গেছে । একেবারে যাচ্ছেতাই অবস্থা । আমার অনেক প্রার্থনার পর সূর্য যদিও বা অস্ত গেল গোধূলির আলো অন্ধকার নামার পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে । উফ ! কী অসহ্য !
অবশেষে এল সেই কাঙ্খিত সন্ধ্যা ।তার আগেই আমি পৌঁছে গিয়েছি আমার গন্তব্যের দরজায় । এখন শুধু টোকা দেওয়ার অপেক্ষা ! হাতটা উঠেও থেমে গেল । ভিতরে আমার জন্য কি অপেক্ষা করছে কে জানে ! জোরে শ্বাস নিয়ে নিজেকে হালকা করার চেষ্টা করলাম । যাইহোক বুকে সাহস এনে দরজায় টোকা দিতে গেলাম । কিন্তু  দেওয়ার আগেই দরজা খুলে গেল । সামনে দাঁড়িয়ে হিয়া !

-আমি জানতাম তুমি আসবে ।

– শুনে খুশি হলাম । তা আসতে বলার কারণটা জানতে পারি কি ?

– নিশ্চয় । কিন্তু এখানে নয় । ভিতরে এস ।

– চলো । কিন্তু বেশি সময় নেই । একটা জরুরী কাজ আছে ।

– খুব রাগ হয়েছে দেখছি । আজ সব রাগ কমিয়ে দেব ।

– থাক আমার রাগ নিয়ে তুমি কত ভাব সে এই তিরানব্বই দিনে বুঝে গেছি ।

– বাব্বা । একেবারে দিনক্ষন গুনে মনে রেখেছ ।  কিন্তু কেন এমন করেছি যখন জানবে সব রাগ গলে অনুরাগ হয়ে যাবে । এখন এস ।

এ কথার পিঠে কথা না চাপিয়ে চুপচাপ  ভিতরে গেলাম । কিন্তু ভিতরে কাউকে দেখতে পাচ্ছি না তো । ওর মা বোন কোথাও নেই । বাবা তো অফিস থেকে রাতে ফেরে । তার মানে পুরো বাড়ীতে ও একা ! সাহস কম নয় দেখছি ।

– কাকে খুঁজছো ?

– হ্যাঁ । না , মানে তোমার মা…

– মা বোন মামাবাড়িতে । আর বাবা অফিস থেকে ট্রেনিং এ গেছে ।

– হুম । তা তুমি একা বাড়ীতে কেন ?

– নাচের ক্লাস আছে বলে যায় নি ।

– কই ক্লাস ?

– উফ ! বোকার মতো প্রশ্ন করছ কেন ? দেখেও বুঝতে পারছ না যে ক্লাস ডুব দিয়েছি ।

– সে তো বুঝেছি । কিন্তু কেন ?

– আমার এই হাঁদারামকে  নাচ দেখাব বলে । বুঝেছ ।

– সে তো মঞ্চেই দেখতে পাই ।

– না মশাই , এ নাচ শুধু আমার আরাধ্যপুরুষের জন্য । মনে আছে সেদিন বলেছিলাম , তোমায় কিছু দেব । কিন্তু তখন ভেবে পাই নি কি দেব । তারপর মনে হল , আমার নাচ ছাড়া কি আর আছে তোমায় দেওয়ার মতো ।

– হিয়া ! তুমি মাহারি হলে অবশেষে ! বেশ আমিও তবে  জগন্নাথদেব হয়ে সিংহাসনে বসেই  তোমার নৃত্যরস আস্বাদন পারব ।

– তুমি ওড়িশি নৃত্যের গল্প জান !

-জানি । পুরীর মন্দিরের দেবদাসীরা হল মাহারি মানে প্রেমপাগলিনী ।  কিন্তু আমাকে তো ঠুঁটো করে দিলে । তোমাকে ছোঁয়া নিষেধ !

– ভয় নেই । আমি তোমায় যে নাচ দেখাব তার নাম দিয়েছি  দেহনাট্যম । আর এখানে শুধু দর্শক হলে চলবে না । অংশও নিতে হবে  ।

-তাই ? তবে , আমার হাতখানি ধরে নিয়ে চলো সখা । আমি যে নাচ জানি না ।

– সে আমি শিখিয়ে নেব । এখন চুপটি করে চলো  ।

-কোথায় ?

– আমাদের ছাদে । ওখানেই আজ আমাদের নৃত্যমঞ্চ । শিবপার্বতীর রাসলীয়ায় নাগদেবতা যেমন তার উজ্জ্বল মণির সাহায্যে আলোকিত করেছিল তাদের নৃত্যস্থান ঠিক তেমনই জোৎস্না এসে আলোকিত করবে আমাদের আজকের  মঞ্চ । নাগদেবতার মনির আলোকে উজ্জ্বল হয়ে সে দেশের নাম হয়েছিল মনিপুর আর তাদের রাসনৃত্য থেকেই জন্ম নিয়েছিল মনিপুরী নৃত্য । তেমন আমাদের দেহনাট্যম থেকে…

– কি বললে ? শিবপার্বতীর রাসলীলা ?

– হ্যাঁ মশাই । ভুলে যেও না নৃত্যের দেবতা নটরাজ মানে শিব ।  রাধাকৃষ্ণের রাসলীলা দেখে মুগ্ধ হয়ে শিবপার্বতীও সেই নৃত্য করেন । তুমি তো আমার সেই শিব । এখন চলো তো ছাদে ।

-কিন্তু…

– সবাই দেখে ফেলবে , এই ভয় পাচ্ছো তো ? দেখুক । হি হি হি । ভয় নেই মশাই । ছাদভর্তি  আমার বাবার প্রিয় সব গাছ । সেই গাছ আমাদের জন্য কুঞ্জবন তৈরী করে রেখেছে । বুঝেছ । আচ্ছা , তুমি ছাদে গিয়ে একটু বোসো । আমি নৃত্যসজ্জা সেরেই আসছি ।

খানিক পর ছাদে এল হিয়া । এ কী দেখছি আমি !  এমন নৃত্যসাজ ! এ-ও কী সম্ভব  ! সারা শরীরে কোথাও এতটুকু কাপড়ের টুকরো নেই ! সমস্ত দেহাঙ্গে শুধু লালমাটির প্রলেপ ! আর নাকে কানে সিঁথিতে বাজুতে মণিবন্ধে গলায় কোমরে পোড়ামাটির টেম্পল জুয়েলারী ! আমাদের দেশে মন্দিরের দেওয়ালে যেমন নৃত্যমূর্তি দেখা যায় হিয়াকে অবিকল তেমন দেখাচ্ছে । হস্তমুদ্রায় ফুটিয়েছে ফুল । দৃষ্টিতে রয়েছে প্রেম । দাঁড়ানোর ভঙ্গিও স্বর্গের দেবীর মতো ।

আমি মুহুর্তের মধ্যে খাজুরাহ পৌঁছে গেলাম । মন্দির জুড়ে যেখানে প্রতিটি মূর্তি বেশভূষাহীন । হিয়া তেমনই এক মূর্তি হয়ে নেমে এসেছে আমার কাছে ।

তখনই মনে পড়ল গতবছর এই খাজুরাহতে সারা ভারত ডান্স ফেস্টিভ্যালে অংশ নিতে গিয়েছিল হিয়া । মন্দিরের ভাস্কর্য দেখে বলেছিল , আমার নৃত্যরতা মূর্তিও যদি কোথাও এমন স্থান পেত ধন্য হয়ে যেতাম ।

হঠাৎ বেজে উঠল কিঙ্কিণী । তাকিয়ে দেখি , হিয়া দিগঙ্গনা হয়ে নৃত্য শুরু করেছে । ললিতছন্দে ওর শরীর কখনও ভুজঙ্গী , কখনও বা অশ্বক্রান্তা । কখনও কপোতী , কখনও বা অধীরা । দেহের প্রতিটি ভঙ্গি ভাস্কর্যের ছবি হয়ে ধরা দিতে লাগল । নৃত্যের সমস্ত ব্যকরণ ভেঙেচুরে দুমড়ে মুচড়ে নবনৃত্য সৃষ্টি করে চলেছে । ও তখনও আছোঁয়া । আমি কেবল অন্তরিন্দ্রিয় দিয়ে ওর উলঙ্গিনী নৃত্য দেখে চলেছি ।

আর ভাবছি ও সত্যি ইচ্ছেনদী । সব ঢেউ শান্ত করতে করতে কেমন সুন্দর করে মোহনার দিকে এগিয়ে চলেছে । আমি সমুদ্র হয়ে যতই উত্তাল হই সময় না হলে মহাসঙ্গম হবে  না । মহাসঙ্গমের ভাবনা মাথায় আসামাত্রই দেখি ওর বাম হাত মুষ্ঠিকারে স্থাপিত হল বক্ষে, আর  ডান হাত চারিত হল যোনিতায় । এমন আঙ্গিকে স্থির হল ও ।

আমি মন্ত্রমুগ্ধ । বুঝতে পারছি না কি করব । হাঁটু গেড়ে বসে আঙুল ছোঁওয়াব ওর নিতম্বে ? নাকি মাথা ঠেকাব জঙ্ঘায় ? ও আমার মনের ইচ্ছা বুঝতে পারল । তাই আঁখিপল্লবে ডাক দিল আমাকে । আমিও যাদুকরের অনুগত শিষ্যের মতো উঠে দাঁড়ালাম । দেখি , ওর একহাতের আঙুলগুলির ফাঁক দিয়ে আমার একহাতের আঙুলগুলোকে প্রবেশ করাল । আর অন্যহাত নেমে এল আমার কোমরে । জড়িয়ে ধরল শর্পিনীর মতো । দুই শরীর মিলিত হয়ে মুহুর্তে সৃষ্টি হল এক অপূর্ব নৃত্যচিত্র ।

তারপর ও নিজের হাতে আমাকে নাগারূপে সাজাল । আর দেখাতে শুরু করল ওষ্ঠমুদ্রা । আমার সারা শরীর এখন ওর নৃত্যমঞ্চ । সেই মঞ্ছে জিহ্বা ও দন্তমুদ্রা দেখাতে দেখাতে হয়ে উঠল রাসেশ্বরী । মুখে বোল পায়ে তাল । দ্রুতলয়ে চলছে । চলতে চলতে ক্রমশ দ্রুততর হচ্ছে । আরো দ্রুত । ও যেন উন্মাদিনী । রনচন্ডিনী । হঠাৎ  আমারও কি যেন হল । ওর চরণতলে নিজেকে সঁপে দিলাম । পায়ের সামনে  আমার বক্ষদেশ পেয়ে ও-ও ওর ডানচরণ রাখল আমার বুকে । ঠিক তখনই  আমি মুক্তকন্ঠে বলে উঠলাম , ‘ দেহিপদপল্লব মুদারম ’ । যুগযুগ ধরে সকল প্রেমিকের যা প্রার্থনা । আজ পূরণ হল আমার । সুখানুভবের চুড়োয় পৌঁছল হৃদয় । আবেশে বুজে এল চোখ । হঠাৎ আমার বক্ষপটে ‘ ঝরঝর ঝরিছে বারিধারা ’ ।

হিয়া কাঁদছে ! কাঁদুক । নতুন জীবন কান্না দিয়েই শুরু করতে হয় । ও যে আর হিয়া নেই । নাচতে নাচতে ও হিয়া থেকে ঋষিতা হয়ে জন্ম নিয়েছে  । গার্হস্থ্য জীবন ভুলে কঠোর তপস্যিনীদের মতো নিজেকে সঁপে দিয়েছে  দেহনাট্যমের কাছে ।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here