শব্দের সঙ্গে সহবাস যার সেই রূপান্তরকামী নারী অনুরাগ মৈত্রেয়ীর Exclusive স্টোরি

0
902

 শব্দের সঙ্গে সহবাস যার সেই রূপান্তরকামী নারী অনুরাগ মৈত্রেয়ীর Exclusive স্টোরি

অবকাশে সঞ্জয়ঃ চলে যায় দিন… রয়ে যায় মুহুর্ত… আর কিছু শব্দের আসাযাওয়া। সত্যিই প্রতিক্ষণে  তাঁর কাছে শব্দেরা আসে। চলেও যায়। আবার নতুন শব্দেরা ভিড় জমায়। কেননা তিনি যে শন্দকেই সবথেকে বেশি ভালোবাসেন। শব্দকেই ধারণ করেছেন কন্ঠে। সেই কন্ঠ হঠাৎই বলে উঠল, দুটো পথ… মন… ভ্রমর…আলোকিত অন্ধকার… অনাহুত মুহুর্তের বুকে কাঁকড়ের আঁচড়…বনশালুকের কপালে চাঁদের গলিপথ…

মুহুর্তের নীরবতা। তারপরেই আবার বলে উঠলেন, কেন ডাকো আমায় বার বার, আমার স্বপ্নগুলো মানসী কল্পনায় ভাসিয়ে দিতে…

শব্দের সঙ্গে সহবাস যার সেই অনুরাগ মৈত্রেয়ীর স্বপ্নের মতো করে সাজানো ঘরে গিয়েছিলাম প্রথাগত ইন্টারভিউ নিতে।  কিন্তু বসামাত্রই  শুরু হল এমনই শব্দের ঝংকারে প্রথা ভেঙে।

আসলে যিনি একাধারে কবি আবার অন্যদিকে বাচিকশিল্পী তাঁর গলায় এমন কবিতা তো প্রতিমুহুর্তে ধরা দেবে এটাই স্বাভাবিক।

তবে তিনি আবার রূপান্তরকামী নারী হিসাবে ভারতের প্রথম বাঙালী সঞ্চালিকা,  যিনি ক্যালকলিং নামক এক ইউটিউব চ্যানেলে রূপান্তরকামীদের সাপ্তাহিক সাক্ষাৎকার নিয়ে ইতিমধ্যেই সাড়া ফেলে দিয়েছেন, সেই অনুরাগ মৈত্রেয়ীর ইন্টারভিউ কি নিছক কিছু প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে হয় নাকি হওয়া উচিৎ?

তাই আড্ডাচ্ছলেই চলল কথা।  কথাই যার সম্পদ, সেই তিনিও  কথায় কথায় বলে গেলেন  তাঁর জীবনের নানা কথা। তাঁর কবিতা লেখার কথা, তাঁর গিটার বাজানোর কথা। নানা গণ আন্দোলনে জড়িয়ে থাকার কথা।

সব রূপান্তরকামী নারী নিজের স্বত্ত্বা কে জানার পর, চেনার পর পুরোপুরি নারী নাম গ্রহণ করেছেন।  তিনিও তেমনি শুধু  মৈত্রেয়ী না হয়ে কেন অনুরাগ মৈত্রেয়ী? এর উত্তরে তিনি এক অদ্ভুত কথা বলেন। অনুরাগের উৎস থেকে মৈত্রেয়ীর আসা। আর আমি উৎসকে অস্বীকার করি না। বরং আমি বিশ্বাস করি, দুটোকেই বহন করে বয়ে চলাই পূর্ণতা। যে পূর্নতার স্বাদ পাওয়ার লড়াইয়ে তিনি অগ্রণী কর্মী, সেই এলজিবিটি আন্দোলনের ভবিষ্যৎ কোথায় দাঁড়িয়ে সে সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, কাউকে বাধ্য করে কিছু গ্রহণ করানো যায় না। মানুষ ধীরে ধীরে হলেও বুঝছে। আমার ধারণা একদিন সকলেই বুঝবে। এবং আমি বিশ্বাস করি,প্রকৃত শিক্ষা ও সচেতনতা একমাত্র উপায় এক উদারমুক্ত সমাজ গড়ার।

নিজেকে কবে থেকে বুঝেছেন? এর উত্তরে তিনি হেসে বলেন, যখন বোঝার বয়স হয় নি, তখন থেকেই। বয়েজ স্কুলে পড়া আমি  ছেলেদের পাশে বসেও বুঝতে পারতাম ওদের ভালোলাগাগুলো আর আমার ভালোলাগাগুলো আলাদা। কেন আলাদা তা বুঝতাম না। কিন্তু আলাদা সেটা বুঝতাম। নিজে ছেলে, অথচ আরেকটি ছেলের প্রতিই আকর্ষণ বোধ করতাম। অন্যরা যেখানে মেয়েদের প্রতি আকৃষ্ট হত। এভাবেই পৌঁছলাম বয়ঃসন্ধিতে। উফফ্‌! সে এক দিন গেছে। নিজের ভিতরের তোলপাড়টা কাউকেই বোঝাতে পারতাম না। শেষে একদিন সাহসের ডানায় ভর দিয়ে মা কে সব বললাম। মা শুনলো। শুনে বলেছিল, তুমি  যদি নিজের লক্ষ্যে অবিচল থাকতে পারো, একদিন সকলেই বুঝবে তোমার কথা। জোর করে কাউকে বোঝাতে যেও না। সেই মা আজ আর নেই। মা এখন স্মৃতি হয়ে রয়ে গিয়েছে। কিন্তু মায়ের ওই কথাগুলো খুব মনে পড়ে। আর মনে পড়লেই লক্ষ্যে অবিচল হয়ে উঠি। বিশ্বাস করি নতুন সূর্য একদিন না একদিন উঠবেই। যে সূর্যের আলোয় রামধনু দেখা দেয়, সেই রামধনু হয়েই গড়ে উঠবে এ সমাজ। সমাজকর্মী হিসেবে এ কেবল তার প্রত্যাশা নয়, বরং তিনি প্রত্যয়ী। আশাহত হয়ে হাল ছাড়তে রাজী নন। বরং তিনি বলেন, কন্ঠ ছাড়ো জোরে।

বাবা-মা দুজনকেই হারিয়ে আজ তিনি একা। একাকীত্ব উপভোগ করলেও মাঝে মাঝে নিঃসঙ্গতা ছায়া ফেলে তাঁর জীবনে। সঙ্গীর জন্য আকুল হয় মন। কিন্তু মনোমত সঙ্গী মেলা ভার। সঙ্গী মানে তো শুধুই মৈথুনের জন্য নয়। মৈথুন শেষেও যে আঁকড়ে ধরে বলবে, এসো, উপভোগ করি প্রতিটি মুহুর্ত।

 

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here