ইতি তোমার পারিক/ সপ্তম পর্ব// অবকাশে সঞ্জয়

0
57

ইতি তোমার পারিক/ সপ্তম পর্ব// অবকাশে সঞ্জয়

                            সাত

প্রিয় স্বপ্নপুরুষ,

আমি জানি ওই অদ্ভুত বইটার লেখক স্বয়ং তুমি। নিজের পরিচয় না দিয়ে অন্যের লেখা ব’লে কিছু শেখানোর পদ্ধতিটা ভালো। যাইহোক পারলে বইটা পড়তে দিও। তবে সত্যি তুমি ভাবতে পারো!

যৌনক্রিয়াও শেখার বিষয়! যে শুনবে সেই হাসবে। বলবে, এ আবার শেখার কি আছে! জামাকাপড় খোল, আর লাগাও।

কিন্তু গভীরভাবে ভাবলে মনে হবে, সত্যি তো ভাবনারই কথা। আচ্ছা বন্য মানুষ কোন্‌টা আগে শিখেছে? পোশাক পরিচ্ছদ ব্যবহার করতে? নাকি যৌনক্রিয়া? সন্তান উৎপাদনের জন্য সঙ্গম আদিম জানি। কিন্তু সমস্ত শরীর দিয়ে যৌনসুখ পাওয়ার কৌশল মানুষ কবে শিখেছে? নিশ্চয় পোশাক ব্যবহারের আগে। শিখেই বুঝেছে শরীরের যেসব অঙ্গ যৌন সুখ দেয় তাকে ঢেকে রাখতে হবে। নইলে যৌনক্রিয়া থেকে মানুষকে বিরত রাখা কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ত। তাই-ই হবে। যৌন অঙ্গ দেখে যৌন অনুভব একমাত্র মানুষেরই আছে।

তুমি এও লিখেছো,জঙ্গলে অন্য প্রাণীর তার সঙ্গিনীকে পিছন থেকে জাপটে ধরা দেখে মানুষ শরীরী মিলন শিখেছে। কিন্তু তখন মানুষের মধ্যে কে পুরুষ কে নারী এই বোধ নিশ্চয় ছিল না। আর ছিল না বলেই পুরুষে পুরুষে শারীরিক মিলন হয়েছিল এবং এক পুরুষ আর এক পুরুষের পায়ুছিদ্রে পুরুষাঙ্গ প্রবেশ করিয়েছিল এবং যৌনসুখ পেয়েছিল। তাই না? কিন্তু তারপর মানুষ পুরুষ নারীর তফাৎ বুঝল। পায়ু যোনির তফাৎ বুঝল। বুঝেই যৌনশাসনের নামে পায়ুকাম নিষিদ্ধ করল। কেন বুঝল না আমরা সংখ্যায় কম হলেও কিছুজন তো আছি।

 

সে যাইহোক, তুমি সব জেনেও লড়াইয়ের কথা বলছ! কেমন করে করব গো! আমরা যে সংখ্যায় অতি নগন্য। একশো কুড়ি কোটির দেশে আমরা যে এক কোটিও নয়। এই গুটিকয়েকজন তোমাদের জনারণ্যে থাকতেই ভয় পাই। তাইতো ঘরছাড়া হয়ে ঘরবসত গড়েছি জনারণ্যের প্রান্তে। না গো, দুমুঠো খেয়ে পরে বাঁচার লড়াইটাই ঠিক মতো করতে পারছি না, সেখানে অধিকারের লড়াই করব! হাসিও না আর।

রাগ করলে! লড়াইয়ের মতো সিরিয়াস ইস্যুকে হাসির বিষয় বললাম বলে! আমাদের দেশে তো তাই হয়। যেটা নিয়ে সিরিয়াসভাবে আলোচনা করার কথা তাকে হাসি ঠাট্টার বিষয় করে উড়িয়ে দেওয়া হয়। মানুষও তাই গভীরভাবে না ভেবে হাসাহাসি করে। এই যে আমরা, যারা শরীরে পুরুষ মনে নারী হয়ে জন্মেছি, তারা কেন শাড়ী পরতে ভালোবাসি, কেন নারীসাজে নিজেদের সাজাই তা নিয়ে সিনেমা-নাটক-শিল্প-সংস্কৃতি কখনো সিরিয়াস ভাবে ভেবেছে। ভাবে নি। বরং আমাদের সাজসজ্জাকে হাসির বিষয় করে উপস্থাপন করেছে। এইসব মাধ্যমের অনেক ক্ষমতা। এরা সিরিয়াস ভাবে আমাদের উপস্থাপন করলে আমরা এমন হাসি ঠাট্টার পাত্রী হতাম না।

তুমি হয়তো বলবে, আমরাও তো এর প্রতিবাদ করি না। বরং সেই হাসি ঠাট্টায় যোগ দিই। ভুল। প্রতিবাদ করি। ভীষণভাবে প্রতিবাদ করি। শুধু প্রতিবাদের ধরনটা আলাদা। দুই হাতে বিশেষ ধরনের তালি দিয়ে আমাদের প্রতিবাদ। ওই তালির আওয়াজ এমনই যে ট্রেনসুদ্ধ কামরায় দুবার তালি দিয়ে সবাইকে চুপ করিয়ে দিতে পারি। উল্টে কিছু রোজগারও হয়ে যায়।

এই ট্রেনের কথায় মনে পড়ল, তখন কলেজ শেষ করে চাকরী খুঁজছি। জানতাম পাব না। তবু বৃথা আশা মরিয়াও মরে না। তো যাতায়াতে ট্রেনে উঠতাম। ভিড় এড়াতে লেডিস কামরায় উঠতাম। আমার পরনে শালোয়ার কামিজ থাকলেও সহযাত্রীরা প্রায়ই সন্দেহের চোখে তাকাতো। গায়ে গা ঠেকে গেলে এমন করে নাক মুখ বাঁকাতো আমি যেন অস্পৃশ্য। আমার ছোঁয়ায় যেন  ওদের গা ঘিনিয়ে উঠতো। তবু আমি মুখ বুজে থাকতাম। বলতে পারবে আমার অপরাধটা কি?

আমাদের অধিকারের কথা বলছিলে না? শুধু যৌনতার অধিকার নয় গো, এই যে আমাদের লোকে অস্পৃশ্য ভাবে তার থেকে মুক্তির অধিকার, রাস্তাঘাটে পাবলিক টয়লেটের অধিকার, হাসপাতালে চিকিৎসার অধিকার… কত বলব! আমাদের জন্য কিচ্ছু নেই। এইডস্‌ রোগীর জন্য এদেশের হাসপাতাল একটা বেড দেয়, কিন্তু তৃতীয় লিঙ্গের জন্য বেড তো দূর অস্ত, করিডোরেও ঠাঁই নেই।

এসব অধিকারের জন্য কি করতে হবে বলো? তালি মারতে হবে? নাকি তালি ছাড়তে হবে?

ইসস্‌, কেমন ভাষণের মতো শোনাচ্ছে! কি করবে বলো! সহ্য করে নিও। তুমি ছাড়া আর কার কাছে বলব! এতদিন মাথার বালিশকে বলতাম। এখন তোমায় বলি।

তোমার সঙ্গে একদিন দেখা করার ইচ্ছা। তবে কবে তা বলতে পারব না। আদৌ কোনদিন হবে কিনা তাও জানি না। আমাদের এখানে তো পছন্দের জনকে নিয়ে আসার অনুমতি নেই। আবার আমিও যখন তখন ছুটি পাই না। কালেভদ্রে ছুটি মেলে। এবার ছুটি পেলে যাব, আমার স্বপ্নপুরুষকে একবার ছুঁয়ে দেখতে।

ইতি

তোমার রূপকথা

মধ্যরাতে তোমার একা হওয়ার সুযোগ আছে। আমার নেই। তাই রাতে হোয়াটসাপে আসা হয় না গো। কোনরকমে তোমার ড্রিমনিউজটা পড়ি। ( চলবে )

 

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here