“স্যার আপনার মাকে আপনি মারছিলেন!”- সঞ্চালিকা মৌ সেনগুপ্তের কলমে এক মর্মস্পর্শী কাহিনি

0
166
ছবি সৌজন্যে - ইন্টারনেট ও লেখক মৌ সেনগুপ্ত

“স্যার আপনার মাকে আপনি মারছিলেন!”- সঞ্চালিকা মৌ সেনগুপ্তের কলমে এক মর্মস্পর্শী কাহিনি

ছবি সৌজন্যে – ইন্টারনেট ও লেখক মৌ সেনগুপ্ত

সময় কথাটা ছোট্ট হলেও তা যেন একটা বিরাট গভীর সমুদ্রের মতো- তট থেকে যতই দূরে চাও কূল নেই, নেই চর, শুধু আকাশ পারে তাই দিকচক্রপাল হয়ে তা চোখে ধরা পড়ে, এখন সেই ছোট্টবেলার দিক্‌চক্রবালের দিকে তাকিয়ে দেখি, তখন ধরা পড়ে- বহু ঘটনার মাঝে পড়ে থাকা কোন কোন ঘটনা, আজ তা একাকীত্বের দাঁড়িয়ে থাকা আমিকে নতুনভাবে ভাবাতে চেষ্টা করে।

ছুটির দিনের ছোট্টবেলার দুপুরগুলো ছিল আদর মাখানো দুপুরে ছুটির দিন পেটভর্তি মাংসভাত খাওয়ার পরই এক ছুট্টে চলে যেতাম আচার নিয়ে আলসেতে দাঁড়িয়ে পৃথিবীকে চেনা, পরপর বাড়ির ছাদ পেরিয়ে- কোথায় আমার স্কুল অথবা ঐদিকে কী গড়িয়াহাট…

কী অদ্ভুত বোধ হত- একই আকাশের ছাদ আমাকেও গড়িয়াহাটের লোকজন দেখতে পাচ্ছে না, আমি তাদের দেখতে পাচ্ছি না অথচ- আমরা একই আকাশের নীচে।

এমনি এক গরমের ছুটির দুপুরবেলা আমি মনোযোগ দিয়ে আচার খাচ্ছিলাম, হঠাৎ দুটো বাড়ির ছাদ ডিঙিয়ে চোখটা থমকে গেল- দেখলাম চিলেকোঠা থেকে এক বৃদ্ধাকে একজন লোক টেনে হিঁচড়ে বের করে এনে ছাদের কলে চান করাল, অর্ধনগ্ন জীর্ণ শরীরটাকে মুড়ে দিল অন্য মলিন কাপড়ে। আবার হাতে কী একটা খাবার দিল তারপর মারতে মারতে নিয়ে যাচ্ছিল চিলেকোঠার ঘরে।

আমি নিষ্পন্দ, নিজের নিঃশ্বাসে নিজেই চমকে উঠলাম ‘দুটো মানুষকেই আমি চিনি’- আমার স্যার অঙ্কের টিচার জ্যোতির্ময় বাবু আর তার বৃদ্ধা মা- কিন্তু স্যার এত অমানবিক ভাবে মারছেন? চিৎকার করে ‘স্যার’ বলে ডেকে উঠলাম, চমকে পেছন ফিরে তাকালেন জ্যোতির্ময়বাবু। চোখ মুখে ধরা পড়ে যাবার একটা ভয়ার্ত ভাব।

তাড়াতাড়ি করে বৃদ্ধা মাকে চিলেকোঠায় ঢুকিয়ে দরজা বন্ধ করে দৌড়ে নেমে গেলেন।

দুদিন পর সন্ধ্যেবেলা স্যার আমাকে পড়াতে এলেন, মুখে চোখে যেন একটা অন্যরকম ভাব- আমি নিজেকে সামলাতে পারলাম না- শ্রদ্ধার কাঁচের বলয়টা তখন তখন টুকরো টুকরো হয়ে গেছে- আমি বরাবরই স্পষ্ট বক্তা, সেটা স্যার জানতেন- কোন ভনিতা না করে বলে ফেললাম, ‘স্যার আপনার মাকে আপনি মারছিলেন-আপনাকে…আমি কতটা শ্রদ্ধা করতাম’ আমার মা জলখাবার নিয়ে ঘরে ঢুকে যেন হোঁচট খেলেন- বলে ফেললেন- ‘এ কি কথা তুমি স্যারের সম্পর্কে বলছ?’

আমি কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলাম, স্যার বললেন, ‘ বৌঠান বিনি ঠিক বলেছে’ মুহুর্তটা যেন থমকে গেল, নিস্তব্ধতা ভেঙে স্যার বলতে লাগলেন- ‘ছোটভাই জাহাজের চাকরী ছেড়ে- কলকাতায় স্থিত হয়ে অন্য চাকরীতে ঢুকেছে, মায়ের নামে রাখা বাড়িটা এখনই তার নামে করে দিতে হবে মাকে কতবার বুঝিয়েছি- আমার তেমন কোন আয় নেই- এই কটা টিউশনী, বাড়িটা লিখে দিলে ভাই বলেছে আমাদের থাকতে দেবে। মা তো কিছুতেই রাজী হচ্ছেন না, ভাইয়ের গায়ের জোর, অর্থের জোর… সবই তো বেশি… আমি তো আর…

এই পর্যন্ত বলে জ্যোতির্ময়বাবু চুপ করে গেলেন, দেওয়াল ঘড়িতে ঢং ঢং করে নটা বাজল।

আমি মা – আর স্যার।

কিছুক্ষণ পর স্যার কিছু না বলেই নিঃশব্দে বেরিয়ে গেলেন, সুদকষা – অঙ্কের পাতাটায় একফোঁটা জল, কিন্তু আমার কেমন যেন স্যারের প্রতি একটা বিতৃষ্ণা, ঘেন্না জমাট হয়ে রইল।

নাঃ – এরপর আর জ্যোতির্ময়বাবু আমাকে পড়াতে আসেন নি, দুদিন পর বাবা খবর আনলেন- বেলা নটা পার হয়ে যেতে জ্যোতির্ময় বাবুকে চিলেকোঠা থেকে নামতে না দেখে তার ছোটভাই মনীন্দ্র ওপরে ওঠে, বহু ডাকাডাকির পর লোক দিয়ে দরজা ভাঙতে দেখা গেল বদ্ধ আলো আঁধারির ঘরে জ্যোতির্ময়বাবুর ঝুলন্ত অর্ধনগ্ন দেহ, আর মাটিতে পড়ে কুঁকড়ে- চোখ ঠিকরে আসা- মায়ের নিথর দেহখানি।

বোর্ডপিন-এ আঁটা কাগজখানিতে লেখা-

“ আমার শরীরে ক্যানসারের বীজ ঢুকেছে, তাই এভাবে বাঁচতে চাই

আর একবার মরে যদি বাঁচা যায় আর মাকে ছাড়া তো বাঁচব না তাই মাকেও নিয়ে গেলাম।

চলি স্বইচ্ছায়

জ্যোতির্ময় নন্দী

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here