প্রসঙ্গঃ শক্তিপদ রাজগুরু লিখেছেন প্রাবন্ধিক মানস চক্রবর্ত্তী

0
58

প্রসঙ্গঃ শক্তিপদ রাজগুরু লিখেছেন প্রাবন্ধিক মানস চক্রবর্ত্তী

  • প্রসঙ্গঃ শক্তিপদ রাজগুরু
  • মানস চক্রবর্ত্তী
  • শক্তিপদ রাজগুরু কেবলমাত্র সাহিত্যিক হিসাবেই খ্যাতিমান নন। অসাধারণ ব্যক্তিত্ব ও ব্যক্তি হিসাবেও তাঁর খ্যাতি ও জনপ্রিয়তা তর্কাতীত।সহজ-সরল-উদারচেতা ও নিরহংকারী এই মানুষটিকে তাঁর সমসাময়িক ও পরবর্তীকালের প্রায় সমস্ত কথাকাররাই ভীষণ শ্রদ্ধার চোখে দেখেন ও তাঁর সৃষ্টিমূলক সাহিত্যমূল্য সম্বন্ধে উচ্চধারণা পোষণ করেন।এককথায় তিনি ছিলেন মাটির মানুষ।লালমাটির মানুষ।রাঙামাটির দেশ বাঁকুড়াজেলার বড়জেলার বড়জোড়া থানার গোপবান্দী(গোপবাঁধ বা গয়লা্বাঁধ)নামক গ্রামে ১৯২২ সালের ১লা ফেব্রুয়ারী তাঁর জন্ম হয়।তাঁর পিতার নাম মনীন্দ্রনাথ ও মাতার নাম শবাসনা দেবী।দুই কন্যার পর শক্তিপদ তাঁদের প্রথম পুত্র।তাঁরা চারভাই ও চারবোন।তাঁর পূর্বপূরুষের আদিনিবাস ছিল ইন্দাসের কাছে কেষ্টবাটী বা কৃষ্ণবাটী গ্রামে।তাঁর পরিবারের আসল পদবী ‘মুখোপাধ্যায়’।তাঁর পূর্বপুরুষ কোন এক রাজার রাজগুরু ছিলেন;সেই সূত্রেই তাঁদের এই রাজকীয় উপাধি ‘রাজগুরু’।কথিত আছে যে,কোন এক মল্লরাজের সঙ্গে(সম্ভবত লাল বাঈয়ের প্রেমিক রাজা রঘুনাথ সিংহের আমলে) তাঁর পূর্বতন পুরুষের কোনো বিষয়ে মতান্তর বা মনান্তর ঘটে।এর ফলে মল্লরাজ্য ত্যাগ করে সপরিবারে সকলে পঞ্চকোটের কালীপুরের রাজার এলাকায় চলে আসেন।
  • তাঁর মামার বাড়ি ছিল সোনামুখীর কাছে হামির-হাটিতে।তাঁর মাতৃকুল ছিলেন গোস্বামী বংশের বংশধর।মাতুলালয়ের মতোই তাঁর পিতৃকুলও ছিলেন বৈষ্ণব ভাবাপন্ন।তাঁদের কুলদেবতা শ্রী শ্রী দামোদর চন্দ্র।
  • শক্তিপদ রাজগুরুর ছেলেবেলাটা গ্রাম্য প্রকৃতির মুক্ত পরিবেশে পড়াশুনা-খেলাধূলা বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে মেলামেশা ইত্যাদির মধ্যে দিয়ে মহানন্দে অতিবাহিত হয়েছে।গোপবান্দী গ্রামের নীলু পন্ডিতের পাঠশালায় তাঁর শিক্ষা জীবনের শুরু হয়।এই পাঠশালায় তিনি প্রায় তিনবৎসর পড়াশুনা করেছিলেন।তারপর পার্শ্ববর্তী দধিমুখা গ্রামে এম.ই.স্কুলে তিনি প্রায় ছয়মাস পড়েন।তাঁর পিতা ডাকবিভাগের কর্মচারী ছিলেন।তাঁর ছিল বদলির চাকরি। ফলে বদলির কারনে তাঁর বাবাকে বাঁকুড়া থেকে মুর্শিদাবাদে নতুন কর্মস্থলে চলে যেতে হয়। ভাইবোনদের সঙ্গে বালক শক্তিপদকে মা-বাবার সঙ্গী হতে হয়। ইচ্ছে না থাকলেও নিরুপায় হয়ে জন্মভূমির মাটির মায়া তাঁকে ত্যাগ করতে হয়েছিল। উদ্বাস্তুর মতো বাঁকুড়ার গোপবান্দী ছেড়ে মুর্শিদাবাদের পাঁচথুপিতে শুরু হয় তাঁর নতুন জীবন। পাঁচথুপি গ্রামটা মুর্শিদাবাদ ও বীরভূম জেলার সীমান্তবর্ত্তী প্রত্যন্ত অঞ্চলে অবস্থিত। এটি ছিল একটি বর্ধিষ্ণু গ্রাম। এখানে পাঁচটি প্রাচীন বৌদ্ধস্তূপ থাকার কারণে গ্রামটির এরকম নাম। এখানকার স্নিগ্ধ মনোরম সবুজ গাছপালা,শস্যক্ষেত্র,জলভরা নদী ইত্যাদি প্রকৃতির রূপ ও সৌন্দর্য বালক শক্তিপদর ভালো লেগে যায়। এখানে চতুর্থ শ্রেণীটা সুমন মাস্টারের পাঠশালায় পড়বার পর পাঁচথুপির ত্রৈলোক্যনাথ ইন্সটিটিউশানে তিনি ভর্ত্তি হন। এখানে তাঁর সমবয়সী বহু বন্ধু জুটেছিল। তাঁদের মধ্যে ডানপিটে চরিত্রের কম্পা ও ন্যাড়ার নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। কম্পাকে নিয়ে পরবর্তীকালে ‘কম্পা দি গ্রেট’, ‘কম্পা কাহিনি’ ইত্যাদি কিশোর সাহিত্যগ্রন্থ তিনি রচনা করেছেন। এই কম্পা, ন্যাড়া প্রমুখ বন্ধুদের সঙ্গে সাইকেল নিয়ে নতুন স্থান নতুন মানুষ দেখার নেশায় তিনি ভ্রমণ অভিযানে বের হতেন। সাধারণত গ্রীষ্মের বা পুজোর ছুটিতে চলতো এই অভিযান। এভাবে কৌতূহলী মন নিয়ে কিশোর বয়সেই বীরভূমের ভূমিপুত্র তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের দেশের মাটি-মানুষ-প্রাকৃতিক পরিবেশ-ভাষা-লোক সংস্কৃতিকে তিনি চোখে দেখে চিনে ফেলেছিলেন। পাঁচথুপিতে স্কুলে পড়ার সময় থেকে কিশোর শক্তিপদ ক্রমশ সাহিত্যপাঠে আকৃষ্ট হয়ে ওঠেন। মা-বাবা-দিদিদের জন্য বাণীমন্দির লাইব্রেরি থেকে তিনি বই আনতে যেতেন। বড়দের পড়ার আগেই তিনি লুকিয়ে সে-সব বই পড়ে ফেলতেন। এভাবেই বঙ্কিম ও শরৎচন্দ্রের অধিকাংশ উপন্যাস তাঁর পড়া হয়ে যায়। পরে বিভূতিভূষণ ও তারাশঙ্করের তিনি মুগ্ধ পাঠক হয়ে ওঠেন। এভাবেই অগ্রজ সাহিত্যিকরা তাঁকে প্রভাবিত ও অনুপ্রাণিত করেছেন। পড়াশুনা, খেলাধূলা,সাহিত্যপাঠ,ভ্রমণ অভিযান ইত্যাদির মধ্য দিয়ে স্কুল জীবনের গন্ডী তিনি পেরিয়ে যান। তিনি স্কুলের ছাত্র থাকাকালীনই তাঁর দুই দিদির বিবাহ হয়ে যায়। ১৯৩৮ সালে ষোল বছর বয়সে ত্রৈলোক্যনাথ ইন্সটিটিউশন থেকে তিনি ম্যাট্রিক পাশ করেন। এরপর পাঁচথুপি থেকে প্রায় ত্রিশ মাইল দূরে বহরমপুর কৃষ্ণনাথ কলেজে তিনি ভর্ত্তি হন। এই কলেজের হোস্টেলে থেকে তিনি পড়াশুনা করতেন। এখান থেকেই তিনি ১৯৪০ সালে আই.এস.সি. পাশ করেন। এরপর বি.এস.সি. পড়ার জন্য এই কলেজেই কিছুদিন তিনি ক্লাস করেন। কিন্তু পিতার অকস্মাৎ মৃত্যুতে তাঁর সব পরিকল্পনা উলটপালট হয়ে যায়। পাঁচথুপির পর মুর্শিদাবাদ জেলার জঙ্গীপুর, ভগবানগোলা প্রভৃতি স্থানে তাঁর পিতা চাকরি করেছেন। প্রায় পঞ্চান্ন বৎসর বয়সে বহরমপুর সরকারি হাসপাতালে তাঁর পিতা প্রয়াত হন। পুনরায় তাঁর মা অন্যান্য সন্তানদের নিয়ে অসহায়ভাবে ফিরে আসেন স্বামীর ভিটে গোপবান্দী গ্রামে। তরুন শক্তিপদর এই দুঃসময়ে প্রায় এক-দেড় বছর পড়াশুনায় ছেদ পড়ে। বাড়ির বড়ছেলে হিসাবে চাকরির জন্য তাঁকে সচেষ্ট হতে হয়। তাই টাইপ-শর্টহ্যান্ড শিখে ডাক বিভাগে চাকরির দরখাস্ত করেন। ১৯৪২ সালে চাকরির পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে জুন-জুলাই মাসে তিনি কলকাতার জি.পি.ও.তে যোগ দেন। চাকরি পাওয়ার পর রিপন কলেজের সান্ধ্য বিভাগে কমার্স সেকশানে তিনি ভর্ত্তি হন; এবং ১৯৪৫ সালে বি.কম. পাশ করেন। প্রয়োজনে সায়েন্স বিভাগ থেকে কমার্স সেকশানে তিনি ভর্ত্তি হয়েছিলেন। ইতিমধ্যে অন্য বোনেদেরও বিবাহ হয়ে যায়। ১৯৪৬ সালে মুর্শিদাবাদের কান্দি শহরের মনিমোহন চট্টোপাধ্যায়ের কন্যা পদ্মারানির সঙ্গে শক্তিবাবুর বিবাহ হয়। তাঁদের দুই পুত্র যথা পার্থসারথি ও ফাল্গুনী। স্ত্রী পদ্মারানিকে নিয়ে শক্তিবাবু প্রায় ৬২ বছরের সংসার বা দাম্পত্যজীবন অতিবাহিত করেছিলেন। ২০০৮ সালে শক্তিবাবুর যখন প্রায় ৮৬ বছর বয়স তখন তাঁর স্ত্রী গত হন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, শক্তিবাবুর মাতা শবাসনা দেবী দীর্ঘজীবী ছিলেন। তিনি প্রায় ১০২ বছর বয়স পর্যন্ত জীবিত ছিলেন। শক্তিবাবু কয়েকটি আত্মজীবনীমূলক তাঁর মায়ের কথা পরোক্ষভাবে উল্লেখ করেছেন।
  • কথাশিল্পী শক্তিপদ রাজগুরু আধুনিক বাংলা সাহিত্য ও ভারতীয় চলচ্চিত্র জগতের এক অগ্রগণ্য ও স্বনামধন্য ব্যক্তি তথা জ্যোতিষ্ক। উপন্যাস,নাটক,কিশোর সাহিত্য,প্রবন্ধ ইত্যাদিতে তাঁর যেমন বিপুল সৃষ্টি তেমনই তাঁর কাহিনি নির্ভর চলচ্চিত্রের সংখ্যাও যথেষ্ট দীর্ঘ। বিভিন্ন প্রকাশনা সংস্থা থেকে প্রকাশিত তাঁর অসংখ্য গ্রন্থ পাঠকদের কাছে যথেষ্ট সমাদর লাভ করতে সক্ষম হয়েছে। তাঁর এই তর্কাতীত জনপ্রিয়তা ও ঈর্ষাজনক পাঠকসংখ্যার প্রধান কারণ হল তাঁর কাহিনিগুলির সাবলীল গতি ও ভাষার গভীর টান। তাঁর লেখা কাহিনিগুলির অভাবনীয় বিন্যাস ও বৈচিত্র্যও এই জনপ্রিয়তার একটি অন্যতম কারণ।
  • তাঁর সৃষ্টির মতোই ব্যক্তি মানুষ হিসেবেও তিনি বিশেষ বিষ্ময়ের। সাধারণত ৭৫ বৎসর যেখানে একজন মানুষ জীবিতই থাকে না সেখানে তিনি তাঁর দীর্ঘ ৯২ বৎসরের জীবনে প্রায় ৭৫ বৎসর অবিচ্ছেদ্যভাবে লিখে গেছেন। ১৯৪২ সালে ডাকবিভাগে তিনি বাইশ বৎসর বয়সে যোগদান করেন আর চাকরী থেকে অবসর নেন ১৯৮০ সালে। অর্থাৎ দীর্ঘ ৩৮ বৎসর তিনি এই দপ্তরে চাকরি করেছেন। তা স্বত্ত্বেও সারাজীবনে তিনি দুই শতাধিক উপন্যাস, অসংখ্য নাটক, গল্প, প্রবন্ধ, ফিচার,চিত্রনাট্য ইত্যাদি লিখেছেন। তাঁর লেখা গ্রন্থের সংখ্যা প্রায় তিনশত। বিষ্ময়ের আরও কারণ হল, বাঁকুড়া জেলার বড়জোড়া থানার একটি অখ্যাত জনপদ গোপবান্দী থেকে তিনি যে ভারতজোড়া খ্যাতি অর্জন করেছেন তা কিন্তু সাধারণ সাফল্য নয়। জীবনের নানা অভিজ্ঞতা তাঁকে লেখক হিসাবে পরিনত ও সুপক্ক হতে সাহায্য করেছে।
  • চলচ্চিত্রের কাহিনি ও চিত্রনাট্য রচনার জন্যও তিনি বিপুল জনপ্রিয়তা ও খ্যাতি অর্জন করেছেন। তাঁর লেখা কাহিনি ও চিত্রনাট্য থেকে যে সমস্ত চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে বা হওয়ার কথা ছিল সেগুলির নাম-মুক্তির সাল ও পরিচালকরা হলেন – (১) সীমন্তিনী (মুক্তি পায় নি) গুণময় বন্দ্যোপাধ্যায়, (২) মেঘে ঢাকা তারা (১৯৬০) ঋত্বিক ঘটক, (৩) কুমারী মন (১৯৭০) চিত্ররথ, (৪) জীবন কাহিনি ( ১৯৬৪) রাজেন মজুমদার, (৫) মুক্তি স্নান (১৯৭০) অজিত গাঙ্গুলী, (৬)অমানুষ (১৯৭৪) শক্তি সামন্ত, (৭) অনুসন্ধান (১৯৮১) শক্তি সামন্ত, (৮)পিপাসা (১৯৮২) ইন্দর সেন, (৯) উত্তর মেলেনি (১৯৮২) উদয় ভট্টাচার্য্য, (১০) অন্যায় অবিচার (১৯৮৫) শক্তি সামন্ত,(১১) তিল থেকে তাল (১৯৮৫) শান্তিময় বন্দ্যোপাধ্যায়, (১২) অচেনা মুখ (১৯৮৬) অজিত লাহিড়ি, (১৩) গায়ক (১৯৮৭) শান্তনু ভৌমিক, (১৪) আশা ও ভালোবাস(১৯৮৮)সুজিত গুহ, (১৫) অন্তরঙ্গ (১৯৮৮) দীনেন গুপ্ত, (১৬) পথে যেতে যেতে (১৯৮৮) উমানাথ ভট্টাচার্য্য, (১৭) আমার তুমি (১৯৮৯) বিমল রায়, (১৮) জবাব (১৯৮৯) জ্যোতিপ্রকাশ রায়, (১৯) অভিসার (১৯৮৯) সনৎ দত্ত, (২০) ঘরের বউ (১৯৯১) স্বপন সাহা, (২১) শেষ আঘাত (১৯৯০) জয়ন্ত পুরকায়স্থ, (২২) বলিদান (১৯৯০) অনিল গাঙ্গুলী (২৩) আমার সাথী (১৯৯১) সলিল দত্ত, (২৪) অন্তরের ভালোবাসা (১৯৯১) বিমল রায়, (২৫) লাল পাহাড়ী (১৯৯২) জহর বিশ্বাস, (২৬) মা (১৯৯২) প্রশান্ত নন্দ, (২৭) কুচবরণ কন্যা (১৯৯৩) আজিজুর রহমান, (২৮) মিষ্টি মধুর (১৯৯৩) শান্তিময় বন্দ্যোপাধ্যায়, (২৯) বধূ ( ১৯৯৩) রানা মুখার্জী, (৩০) অবুঝ মন (১৯৯৬) স্বপন সাহা, (৩১) পরিক্রমা ( ১৯৯৬) শান্তিময় বন্দ্যোপাধ্যায়, (৩২) মনের মানুষ (১৯৯৭) সুজিত গুহ, (৩৩) অন্ধ প্রেম ( ১৯৯৯) নারায়ণ চক্রবর্ত্তী, (৩৪) গঙ্গা (২০০০) সুজিত গুহ, (৩৫) স্বপ্ন (২০০৩) হরনাথ চক্রবর্ত্তী, (৩৬) অগ্নিশপথ ( ২০০৪) প্রবীর নন্দী, (৩৭) আশা (২০০৫) শিবনাথ চক্রবর্ত্তী, (৩৮) মেজদিদি(২০০৫)……………………(৩৯) দেবদাস (২০০৫) শক্তি সামন্ত, (৪০) ভালোবাসা ভালোবাসা (২০০৮) রবি কিনাগী, (৪১) যোদ্ধা (২০১১) এবং (৪২) হরেকৃষ্ণ জুয়েলার্স এর কাজ চলছে। এছাড়াও ‘অগ্নিযুগের পদাতিক’ নামক একটি টিভি সিরিয়াল তাঁর লেখা উপন্যাস থেকে নির্মিত হয়েছে।
  • তাঁর লেখা কাহিনি ও চিত্রনাট্য নিয়ে যে সমস্ত চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে সেগুলিতে পশ্চিমবঙ্গ, মুম্বাই ও বাংলাদেশের যে সমস্ত অভিনেতা অভিনেত্রীরা বিভিন্ন সময়ে অভিনয় করেছেন তাঁদের কয়েকজন হলেন- কমল মিত্র, বিকাশ রায়, উৎপল দত্ত, জ্ঞানেশ মুখার্জী, জহর গাঙ্গুলী, দিলীপ মুখার্জী, অনিল চ্যাটার্জী, উত্তম কুমার, সৌমিত্র চ্যাটার্জী, দিলীপ রায়, নির্মল কুমার, শুভেন্দু চট্টোপাধ্যায়, রবি ঘোষ, মনোজ মিত্র, অনুপ কুমার, দীপঙ্কর দে, রঞ্জিত মল্লিক, বিপ্লব চট্টোপাধ্যায়, দেবরাজ রায়, সন্তু মুখার্জী, চিন্ময় রায়, অমিতাভ বচ্চন, আমজাদ খান, মিঠুন চক্রবর্ত্তী, প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়, সৌমিত্র ব্যানার্জী, শক্তি ঠাকুর, অমিত কুমার, তাপস পাল, সুব্রত ভট্টাচার্য্য (ফুটবলার), চিরঞ্জিত চক্রবর্ত্তী, অর্জুন চক্রবর্ত্তী, অভিষেক চ্যাটার্জী, যীশু সেনগুপ্ত, সোহম, দেব, ছায়া দেবী, সুপ্রিয়া দেবী, সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়, সন্ধ্যা রায়, তনুজা, জুঁই ব্যানার্জী, শর্মিলা ঠাকুর, রাখী, সুমিত্রা, অনামিকা সাহা, সোমা দে, মুনমুন সেন, শকুন্তলা বড়ুয়া, মহুয়া রায়চৌধুরী, দেবশ্রী, পাপিয়া অধিকারী, রোজিনা, শতাব্দী, ইন্দ্রানী হালদার, মন্দাকিনী, দীপিকা, ফারহা, ঋতুপর্না সেনগুপ্ত, অর্পিতা প্রমুখ।
  • যে সমস্ত প্রকাশনী সংস্থা বিভিন্ন সময়ে তাঁর লেখা বিভিন্ন প্রকার গ্রন্থ প্রকাশ করেছে সেই সময় প্রকাশনী সংস্থাগুলির কয়েকটির নাম হল- করুণা প্রকাশনী, কামিনী প্রকাশালয়, কিশোর প্রকাশন, কল্লোল, কথাকলি, কিশোর গ্রন্থালয়, দে’জ পাবলিশিং, দীপ প্রকাশন, জয় মা, জয় মালা, জে.এন.চক্রবর্ত্তী, জে.এন.লাইব্রেরি, জ্যোতি প্রকাশন, সাহিত্যলোক, সাহিত্যমন্দির,সাহিত্যমালা,সাহিত্যম, সন্ধ্যা প্রকাশনী, সাহিত্য সংস্থা, সিটি বুক এজেন্সি, সাহিত্যজগৎ, সাহিত্য প্রকাশ, আদিত্য পুস্তকালয়, আনন্দ প্রকাশন, আবাহনী,আরুনি প্রকাশনী, আনন্দম্‌, আরতি প্রকাশনী, পাত্র’জ, পূর্বাচল, প্রভা প্রকাশনী, প্যাপিরাস, প্রিয়া বুক হাউস, পূর্ণ প্রকাশন, পত্রপুট, পত্রভারতী, পুনশ্চ, অঞ্জলি প্রকাশনী, অঙ্কুর, অক্ষর প্রকাশনী, অভয় প্রকাশনী, অপর্না বুক ডিস্ট্রিবিউটর, অনামিকা, রবীন্দ্র লাইব্রেরি, রূপা প্রকাশন, ভৈরব পুস্তকালয়, ভাষা ও সাহিত্য, ভ্যারাইটি পাবলির্শাস, মিত্র ও ঘোষ, মন্ডল বুক হাউস, মৌসুমী প্রকাশনী, মুখার্জী প্রকাশনী, মুখার্জী পাবলিশিং, নন্দিতা পাবলিকেশান, নিউ বেঙ্গল প্রেস, নাথ পাবলিশিং, ন্যাশানাল পাবলিশিং, শঙ্কর প্রকাশন, শাওনি, শিবরানী প্রকাশনী, শশধর প্রকাশনী, বসাক বুক স্টোর, বর্নালী, বিশ্ববানী, বিশ্বাস পাবলিশিং, বুক এম্পোরিয়াম, বসু মল্লিক ব্রাদার্স, এডুকেশন ফোরাম, এম.সি.সরকার এন্ড সন্স, ডি.জে.পাবলিশিং, ডি.এম.লাইব্রেরি, গ্রন্থপীঠ, গুরুদাস চট্টোপাধ্যায় এন্ড সন্স, গ্রন্থপ্রকাশ, গ্রন্থম, চ্যাটার্জী পাবলিশিং, চলন্তিকা প্রকাশন, উমা প্রকাশনী, ইন্ডিয়ান প্রোগ্রেসিভ, যূথিকা বুক স্টল, লোকনাথ মিশন (বারসাত), লিপিকা, ফাল্গুনী প্রকাশনী, ত্রয়ী প্রকাশনী ইত্যাদি।
  • উপরে উল্লেখিত প্রকাশনী সংস্থার সুদীর্ঘ তালিকা দেখে তাঁর সৃষ্টির বিশাল বিপুলতা সম্পর্কে আন্দাজ করা খুবই কঠিন কাজ।
  • তাঁর সাহিত্যে বেশি প্রভাব ফেলেছে বিভূতিভূষণের চোখে দেখা প্রকৃতি এবং তারাশঙ্করের সাহিত্যের মানুষ। তিনি সারান্ডার জঙ্গলে, সুন্দরবনের অরণ্যে, রাঢ়ভূমির আদিবাসীদের বন্যভূমিতে, কয়লাখনির অন্ধকার জগতে,উদ্বাস্তুদের ক্যাম্পে, ভারতের নানা প্রান্তে এমনকি সুদূর আমেরিকাতেও মানুষ খুঁজে বেড়িয়েছেন; সংগ্রহ করেছেন সাহিত্যের উপাদান। সেই সঙ্গে তাঁর গ্রাম গোপবান্দী ও মুর্শিদাবাদের পাঁচথুপি গ্রামের মানুষজন, নদী-মাঠ-গাছপালা প্রভৃতি তো আছেই।
  • আপনমনের মাধুরী মিশিয়ে তিনি তাঁর সাহিত্যে তা ব্যক্ত করেছেন। বাংলা সাহিত্যের অঙ্গনে তাঁর প্রথম পদার্পন ঘটে ১৯৪২ সালে অর্থাৎ তাঁর কুড়ি বছর বয়সে ‘দেশ’ পত্রিকায় ‘আবর্তন’ নামক একটি গল্প প্রকাশের মধ্য দিয়ে। গল্পটি পাঠানোর প্রায় চার-পাঁচদিন পরে পিয়ন এসে চিঠি দিলে জানা যায় যে, গল্পটি মনোনীত হয়েছে। এরপর ‘দেশ’ এ তাঁর লেখা আরো কয়েকটি গল্প প্রকাশিত হয়েছিল। তৎকালীন ‘দেশ’ পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন সাগরময় ঘোষ। তিনি শক্তিবাবুকে লেখা চালিয়ে যাওয়ার উৎসাহ দান করেন। সেই সময় অগ্রজ কিংবদন্তী সাহিত্যিক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় শক্তিপদ বাবুকে বলেছিলেন, ‘এখন থেকে তিনবছর পর উপন্যাস লিখবে। তার আগে অনেক অনেক বই পড়।’ তাঁর কথা ও লিস্ট অনুযায়ী শক্তিবাবু অনেক বই পড়েন। এবং ১৯৪৫ সালে তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘দিনগুলি মোর’ প্রকাশিত হয়। ‘উল্টোরথ’ পত্রিকার সম্পাদক প্রসাদ সিংহের ভাই তাঁর ‘বুক এম্পোরিয়াম’ প্রকাশনী সংস্থা থেকে এটি প্রকাশ করেন। এরপর ১৯৪৮ সালে প্রকাশিত হয় ‘হেথা নয়’ উপন্যাসটি। তারপর ১৯৪৯ সালে প্রকাশ পায় ‘শালপিয়ালের বন।’ তাঁর ‘শেষ নাগ’ উপন্যাসটির নাট্যরূপ দেন নাট্যকার দেবনারায়ন গুপ্ত। এটি ‘শেষাগ্নি’ নামে স্টার থিয়েটারে মঞ্চস্থ হয়েছিল; এবং দর্শকদের কাছে খুবই সমাদর ও জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল। প্রায় সাতশো রজনী ধরে নাটকটি স্টারে চলেছিল। কমল মিত্র, গীতা দে, ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়, অনুপ কুমার প্রমুখ প্রখ্যাত অভিনেতা-অভিনেত্রীরা এটিতে অভিনয় করেছিলেন। ‘শেষ নাগ’ উপন্যাসের ক্রম বজায় পরিপূরক অপর দুটি উপন্যাস হল- ‘বাসাংসি জীর্নানি’ ও ‘রূপান্তর’। এই ট্রিলজি উপন্যাসে জমিদার প্রথার অবক্ষয়ের পর নতুন আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থার যে রূপান্তর আসে তারই চিত্র ফুটে উঠেছে।
  • চাকরীর পাশাপাশি ভারতবর্ষ, বসুমতী, প্রবাসী প্রভৃতি নানা পত্র-পত্রিকায় তিনি গল্প-উপন্যাস লেখা চালিয়ে যেতে থাকলেন। ঐতিহাসিক পটভূমিতে তিনি লিখেছেন ‘মনিবেগম’, ‘লক্ষ্মণাবতী’ প্রভৃতি উপন্যাস। পাশ্চাত্য দেশের পটভূমিতে লিখেছেন, ‘দূরের মানুষ’, ‘যার যেথা ঘর’ ইত্যাদি উপন্যাস।
  • বাংলা সাহিত্যের মহাকাশে যখন তারাশঙ্কর, বনফুল, বিমল মিত্র, অচিন্ত্য সেনগুপ্ত, প্রেমেন্দ্র মিত্র, বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়, আশাপূর্ণা দেবী, গজেন্দ্রকুমার মিত্র, মনোজ বসু, সমরেশ বসু ইত্যাদি জ্যোতিষ্কের সমাবেশ সেই সময় যে মুষ্টিমেয় কয়েকজন লেখক নিজেদের বৈশিষ্ট্যে বাংলা কথাসাহিত্যের আসরে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করেন, শক্তিপদ রাজগুরু তাঁদেরই অন্যতম। দেশ-বিদেশের অসংখ্য মানুষের সান্নিধ্য-ধন্য অভিজ্ঞতা নিয়ে গল্প-উপন্যাস লিখে তিনি বাংলা সাহিত্যে একটি স্থায়ী আসন বিছিয়ে বসেছেন। এত বৈচিত্রময় মানুষ,পটভূমি ও পেশা নিয়ে খুব বেশি লেখক লিখেছেন বলে মনে হয় না। বৈষ্ণব ভাবনা দ্বারা প্রভাবিত হয়ে তিনি লিখেছেন ‘সপ্তম গোস্বামী’, ‘গৌড়জন বধূ’, ‘পরিক্রমা’, প্রভৃতি উপন্যাস। ছেলেবেলার বন্ধুদের নিয়ে লিখেছেন ‘কম্পা দি গ্রেট’, ‘কম্পাকাহিনি’, ইত্যাদি গ্রন্থ। আবার বাল্যস্মৃতি নিয়ে লিখেছেন ‘শেষ প্রহর’ উপন্যাসটি। তারাশঙ্কর দ্বারা প্রভাবিত হয়ে তিনিও কবিয়াল, ঝুমুরের দল, বৈষ্ণব-বৈষ্ণবীদের আখড়া, বাউল, ক্ষয়িষ্ণু জমিদার, তারিনী মাঝিদের মতো চরিত্রদের নিয়ে গল্প-উপন্যাস লিখেছেন। এছাড়াও কয়লাখনির অন্ধকার জগৎ, মৎস্যজীবীদের জীবন সংগ্রাম, উদ্বাস্তু বা ছিন্নমূলদের নিয়েও লিখেছেন অনেক। তিনি ছিন্নমূল ছিলেন না, অথচ কি করে যে তিনি উদ্বাস্তু জীবনের ব্যথা বেদনার এমন নিখুঁত জীবনকে সাহিত্যে রূপায়িত করতেন তা ভেবে অবাক হতে হয়। অন্যদিকে তাঁর লেখা নদীমাতৃক উপন্যাসগুলিও পাঠককে বিশেষভাবে ভাবিত করতে বাধ্য করে।
  • শক্তিপদ রাজগুরু সেই বিরল লেখকগোষ্ঠীর একজন যাঁর লেখা নিয়ে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন চলচ্চিত্র পরিচালক ঋত্বিক ঘটক নির্মান করেছেন শিল্পসম্মত বিখ্যাত চলচ্চিত্র ‘মেঘে ঢাকা তারা’। আবার স্বনামধন্য চলচ্চিত্র পরিচালক শক্তি সামন্ত তৈরি করেছেন ‘অমানুষ’ সহ বেশ কয়েকটি চূড়ান্ত বানিজ্যিক সফল চলচ্চিত্র। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে তাঁর কাহিনি অথবা চিত্রনাট্য অবলম্বনে নির্মিত প্রায় সবকটি চলচ্চিত্রই ব্যবসায়িক সফলতা লাভ করেছে।
  • ১৯৪২ সাল থেকে শুরু করে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত অসংখ্য পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে তাঁর অজস্র লেখা। তাঁর লেখায় বাংলার মাটি ও মানুষের প্রতি গভীর অনুরাগ ও মাতৃত্ববোধ বারংবার ফুটে উঠেছে। বাংলার গ্রাম-শহর-জঙ্গল তথা সর্বত্র বসবাসকারী মানুষের জীবন সংগ্রামকে তিনি মর্যাদা দান করেছেন তাঁর সৃষ্টির মাধ্যমে।
  • শক্তিপদ রাজগুরু এমন একজন ব্যক্তি যাঁর জীবনের যে কোন একটি দিক নিয়েই লেখা যেতে পারে পাতার পর পাতা। প্রকৃত অর্থেই তিনি একজন কিংবদন্তী এবং অগ্রগন্য সাহিত্য সাধক। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত সেই সাধনা থেকে তিনি বিচ্যুত হন নি। নব্বই অতিক্রান্ত বয়সেও তাঁর লেখায় ছিল নতুন নতুন চিন্তাভাবনা ও চমক। ১৪২০ বঙ্গাব্দে ‘শারদাঞ্জলী’ পত্রিকায় প্রকাশিত ‘বনমালী হারিয়ে গেছে’ বা ‘NEWZ বাংলা’ পত্রিকার শারদীয়া ১৪১৯ সংখ্যায় প্রকাশিত ‘বাঘা বায়েন’ বা কিশোর ভারতী পত্রিকার শারদীয়া ১৪১৬ সংখ্যায় প্রকাশিত ‘পটলার কেরামতি’ ইত্যাদি উপন্যাসগুলি তারই প্রকৃষ্ট উদাহরণ।
  • ২০ শে ফেব্রুয়ারি (শনিবার) ২০১০ সালে দক্ষিণ চব্বিশ পরগণার আমতলা রুরাল লাইব্রেরিতে নতুন ভবনের তিনি আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেছিলেন। এই অনুষ্ঠানের প্রধান অথিতি ছিলেন দক্ষিণ চব্বিশ পরগণা জেলা গ্রন্থাগার আধিকারিক তুষারকান্তি চট্টোপাধ্যায়, সভাপতিত্ব করেছিলেন দীপক মুখোপাধ্যায়। প্রদীপ জ্বালিয়ে নতুন ভবনের উদ্বোধন করে শক্তিবাবু বলেছিলেন, ‘এই ধরনের অনুষ্ঠান পাঠক ও গ্রন্থাগারের মধ্যে মেলবন্ধন তৈরি করে। সৃষ্টি হবে ভালো সাহিত্য ও সাহিত্যিক। অতীতে পুজো সংখ্যায় প্রকাশিত গল্প ও উপন্যাস নিয়ে আলোচনা হত। এখন টি.ভি. সিরিয়ালের বাংলা চটুল গল্প ঘুরে-ফিরে আলোচনায় আসে। আমাদের মাতৃভাষাকে বাঁচানোর জন্য সচেষ্ট হতে হবে। লাইব্রেরির প্রতি আকর্ষণ বৃদ্ধি মানেই ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতিও আকর্ষণ বৃদ্ধি’। গ্রন্থকে সাথী হিসেবে গ্রহণ করে, গ্রন্থাগারে নিয়মিত আসার জন্য তিনি সকলকে আহ্বান জানান। গার্ডেনরীচ, কলকাতা-২৪ থেকে প্রকাশিত ‘বাংলার সমৃদ্ধ অঙ্গন’ সহ বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় এই সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল।
  • শক্তিবাবুর লেখা ‘আজকের নায়ক’ নামক একটি উপন্যাস আছে। এটি একটি ব্যতিক্রমী উপন্যাস। সাধারণত গম্প উপন্যাসের সমাপ্তিতে অশুভ শক্তির পরাজয়ের মাধ্যমে শুভশক্তির জয় ঘোষিত হয়, কিন্তু এই উপন্যাসটিতে হয়েছে তার বিপরীত। নেগেটিভ হলেও রমেশ এই উপন্যাসের প্রধান চরিত্র বা নায়ক। ‘আজকের নায়ক’ সহ শক্তিবাবু তাঁর লেখা বহু গল্প-উপন্যাসে এই ধরনের এক্সপেরিমেন্ট করেছেন।
  • সাহিত্যিক শক্তিপদ রাজগুরু বৈচিত্রের সন্ধানী। তাই তাঁর লেখায় বারবার দিক পরিবর্তন হয়েছে। তাঁর রচিত কথাসাহিত্যের একটি অন্যতম ধারা হল উদ্বাস্তু জীবনের অবলম্বনে উপন্যাস। দেশভাগ ও তার ফলে সৃষ্টি হওয়া সমস্যা সম্পর্কে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়,সমরেশ বসু, প্রবোধ কুমার সান্যাল,কৃষ্ণা চক্রবর্ত্তী, অসীম রায়, অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রফুল্ল রায় প্রমুখ সাহিত্যিকরাও গল্প-উপন্যাস লিখেছেন। কিন্তু ঋত্বিক ঘটকের হাত দিয়ে শক্তিবাবুর লেখা ‘মেঘে ঢাকা তারা’ উপন্যাসটি চলচ্চিত্রে রূপায়িত হওয়ার ফলে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে নিয়েছে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে ১৯৫৬ সালে উল্টোরথ পত্রিকায় শক্তিবাবুর লেখা উদ্বাস্তুদের জীবন সংগ্রামের প্রেক্ষাপটে ‘চেনামুখ’ নামক যে নভেলেট বা বড়গল্প প্রকাশিত হয়েছিল, সেটিই পরবর্তীকালে চলচ্চিত্রে ও গ্রন্থাকারে ‘মেঘে ঢাকা তারা’ নামে প্রকাশিত হয়।
  • এই চলচ্চিত্রে নায়িকা নীতার ভূমিকায় অপূর্ব অভিনয় করেছিলেন সুপ্রিয়া দেবী। এই সিনেমাটির মাধ্যমেই বিখ্যাত রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী দেবব্রত বিশ্বাস প্রথম চলচ্চিত্রে গান গাওয়া শুরু করেন। তার আগে তিনি মূলত রেডিওতে গাইতেন। শোনা যায় ঋত্বিক ঘটক পরিচালিত মুক্তিপ্রাপ্ত ছবিগুলির মধ্যে একমাত্র ‘মেঘে ঢাকা তারা’ নাকি বক্স অফিসে অনেকখানি আর্থিক সাফল্য লাভ করেছিল। ‘মেঘে ঢাকা তারা’ নিয়ে দিল্লির মদনগোপাল সিং রিসার্চ পেপার তৈরি করে পি.এইচ.ডি. ডিগ্রি লাভ করেছেন। ‘মেঘে ঢাকা তারা’-র অসাধারনত্ব সিনেমা ও সাহিত্য জগতের অনেককে মুগ্ধ করেছিল। চলচ্চিত্র পরিচালক শক্তি সামন্ত ঋত্বিক ঘটককে মুম্বাইতে নিয়ে গিয়ে এই সিনেমাটিকে হিন্দিতে নতুনভাবে করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ১৯৭৬ সালে ঋত্বিক ঘটক অকালে প্রয়াত হওয়ার ফলে এই পরিকল্পনা সফল হয় নি। ‘মেঘে ঢাকা তারা’ সিনেমাটির পরিচালক হিসাবে ঋত্বিক ঘটক যেমন বিপুল সম্মান লাভ করেন, তেমনি এর কাহিনিকার হিসাবে শক্তিপদ রাজগুরুর নামও সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। আর্থিক টানাটানির কারণে ঋত্বিক ঘটকের কাছে শক্তিবাবু নিজের প্রাপ্য টাকা চাইতে পারেন নি। তার জন্য তাঁর কোন দুঃখও ছিল না। কারণ ঋত্বিকের কাছে তিনি পেয়েছিলেন অকুন্ঠ শ্রদ্ধা, ভালোবাসা আর চিত্রনাট্য লেখার প্রেরণা। এ প্রসঙ্গে শক্তিবাবু লিখেছেন, ‘ঋত্বিকবাবু বলেন-অথর ( Author) গল্প-উপন্যাস তো লেখেছো,চিত্রনাট্য লেখা শেখাটা শেখো ভালো করে, আখেরে কাজ দেবে।’ পরবর্তীকালে চিত্রনাট্য লেখা শেখাটা সত্যই শক্তিবাবুর খুব কাজে লেগেছিল। বহু বাংলা ও হিন্দি ছবির চিত্রনাট্য রচনা করে তিনি যে বিখ্যাত হয়ে আছেন, সে কথা সবার জানা। উদ্বাস্তুদের জীবন সংগ্রাম নিয়ে তাঁর লেখা আরো দুটি উল্লেখযোগ্য উপন্যাস হল ‘তবু বিহঙ্গ’, এবং ‘দন্তক থেকে মরিচঝাঁপি’। এছাড়াও ‘আজকের নায়ক’ সহ আরো বহু উপন্যাস ও গল্পে উদ্বাস্তু জীবনের কথা ঘুরে ফিরে এসেছে।
  • চাকুরী তথা অন্যান্য প্রয়োজনে কলকাতার নাগরিক জীবনের সঙ্গে তিনি যুক্ত হয়েছিলেন ঠিকই। কিন্তু গ্রামবাংলার প্রতি ছিল তাঁর গভীর টান ও অসীম মমত্ববোধ। তাঁর লেখা অধিকাংশ গল্প-উপন্যাসই গ্রাম-আধাশহর বা মফস্বলের পটভূমিতে রচিত হয়েছে। ‘সময় অসময়’ পত্রিকার শারদীয়া ১৪১৯ সংখ্যায় ‘পূজার স্মৃতি’ শীর্ষক এক রচনায় তিনি লিখেছেন যে, ‘…আজ আর মা নেই ঘরে-মা এখন মন্দিরে। তাই পূজা এলেই মন কেমন করে,ভেসে আসে সেই চাঁদের আলো ভরা গ্রাম-শিউলির সুবাস মাখা বাতাস, ঢাকের বাদ্যি, মায়ের মুখ। আজ সে সব হারিয়ে গেছে, শহরের আলো মাইক লোকজনের ভিড় সব মুছে যায়। আমি যেন গ্রামেই শান্ত পরিবেশে ফিরে গেছি।’
  • উপরি উক্ত এই ছোট্ট বক্তব্যটি পড়ে যে কোনও পাঠকেরই মনটা বেদনায় ভারাক্রান্ত হতে বাধ্য। নব্বই অতিক্রান্ত বয়সেও জন্মদাত্রী মা ও জন্মভূমি গ্রামের প্রতি তার অকৃত্রিম অনুরাগই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে এই লেখাটির মাধ্যমে।
  • এই দীর্ঘদেহী, ব্যক্তিত্বময়, স্নেহপূর্ণ, স্বদেশানুরাগী, সাহিত্যপ্রাণ, পাঠক সমাদর ধন্য কথাশিল্পী তথা জীবনশিল্পী সারাজীবনে লিখেছেন প্রায় তিনশত নানা বিষয়ের গ্রন্থ। সেই সমস্ত পুস্তকগুলির কয়েকটি হল- অগ্নিযুগের পদাতিক, অগ্নিস্বাক্ষর, অচিনগাছ, অচিনপাখি, অচিন পাখির বাসা, অচিন পাখির সুর, অচেনা মুখ, অধিকার, অধিগ্রহণ, অধিবাস, অনাথ, অনিকেত, অনুরাগ, অনুসন্ধান, অনেক বসন্ত, অন্তরঙ্গ, অন্তরে অন্তরে, অন্ধকারের যাত্রী, অন্ধবিচার, অন্তবিহীন পথ, অন্য কোনখানে, অন্য মানুষ, অনেক বসন্ত একটি ভ্রমর, অন্য রূপে দেখা, অপরাজিতা, অবাক পৃথিবী, অভয়ারণ্য, অভিনন্দন, অভিষেক, অভ্র নীল রোদ, অমানুষ, অমৃতের স্বাদ, আকাশের রঙ, আঘাত, আগামীকাল, আজ কাল পরশু, আজকের নায়ক, আত্মজ, আদিম আশ্রয়, আঁধারে একটু আলো, আপন ঘরে, আপনজন, আবর্তন, আবির্ভাব, আমি শুধু একা, আলোর ঠিকানা, আলোয় অন্ধকারে, আশা প্রত্যাশা, আশা আশ্রয় ভালোবাসা, ইমান, ঈশ্বরের ঠিকানা, উত্তরের পাখি, উত্তর পুরুষ, উপহার, উত্তর মেলে নি, ঊষা দিশাহারা, এই জনপদ, একার সংসার, কখন অন্য মনে, কড়ি ও কোমল, কল্পতরু রামকৃষ্ণ, কাঁচ কাঞ্চন, কয়লার রঙ কালো, করুনা ধারায় এসো, কাজল গাঁয়ের কাহিনি, কালা পাহাড়, কাঁসাই-এর তীরে, কিছু জানা কিছু অজানা, কিছু পলাশের নেশা, কিছু ভালোবাসা, কুসুমপুরের যৌবন, কুয়াশা যখন, খলসে খালির গঞ্জ, গল্প সংগ্রহ(১ম), গহিন গাঙ গহন বন, গ্রামে গ্রামান্তরে, গ্রীনভ্যালি ফার্ম, গৌড়জন বধূ, গোঁসাই গঞ্জের পাঁচালি, ঘরের ঠিকানা, চর হাসিল, চেনা অচেনা, চেনা মুখ, চোখের আলো, চোখের কাজল, ছায়া নট, জলসা, জলের তিলক, জীবন কাহিনি, জাগৃহি, জীবনের কলরব, জনপদ, জীবন যে রকম, ঝোড়ো হাওয়া, টেনিয়া, ঠিকানায় কেউ ফেরে নি, তবু বিহঙ্গ, তমসা, তারা দুজন, তারে আমি চোখে দেখি নি, তিল থেকে তাল, ত্রিয়াসা, তৃষা, দিন অবসান, দিনগুলি মোর, দিন বদল, দিনের প্রথম আলো, দুজনের পৃথিবী, দুদিনের পরিচয়, দূরের মানুষ, দেশ কাল পাত্র, ধর্মসাক্ষী, লক্ষ্মীপুরের নকীব, নগরে বন্দরে, নতুন সীমান্তে, নগর, নর্তকীর মেলা, জবজন্ম, নয়া বসত, নকল মানুষ, নিঃসঙ্গ যৌবন, নীল চোখের সাগর, নীল নির্জন, নীল পাহাড়, অভ্ররোদ, নীল সমুদ্র সবুজ দেশ, নীলাম্বরী, নোনা গাঙ, নিঃসঙ্গ সৈনিক, পথ বয়ে যায়, পরগাছা, পথের পানে চেয়ে, পথে যেতে যেতে, পথ্য হৃদয়, পরমাত্মীয় পরিক্রমা, পালাবদল, পারঘাট, পিয়াসি মন, পিয়াসী প্রজাপতি, প্রতিরোধ, প্রতি ঘরে ঘরে, প্রেম অমনিবাস (১ম), বধূ, বনবাংলো, বন মাধুরী, বনের আঙিনায়, বনে বনান্তরে, বন্যা এলো, বসন্ত ও ঝরাপাতা, বসন্ত বাহার, বাসর প্রদীপ, বাসাংসি জীর্নানি, বিদিশার সংসার, বিক্ষোভ, বিস্ফোরণ, বেলাভুমি, বাঘা বায়েন, ভগিনী নিবেদিতা, ভালবাসা, ভাঙাগড়ার পালা, ভুল করে চাই, মন অরণ্য, মনিবেগম, মধুকাল, মধুচক্র, মধুমাস, মন মধুকর, মন ময়ূর, মন নিয়ে খেলা, মন মোহনা, মন যারে চায়, মনের আয়না, মনের মানুষ, মসনদ, মহাকাল, মা, মা সারদামনি, মাটির কাছাকাছি, মাটির পুতুল, মাটির মানুষ, মানসী, মানসপ্রিয়া, মানুষের অধিকার, মালঞ্চ, মাশুল, মায়া দিগন্ত, মুক্ত ত্রিবেনী, মুক্ত পুরুষ স্বামী বিবেকানন্দ, মেঘে ঢাকা তারা, মোহিনী মায়া, যার যেথা ঘর, যদি জানতেম, যত দূরে যাই, যৌতুক, যৌবনের নায়িকা, রক্ত নিয়ে খেলা, রঙ্গ বল্লবী, রণভূমি, রতনমনি রিয়া, রাতের পাখিরা, রায়মঙ্গল, রূপ বদল, রূপরঙ্গ, রূপান্তর, রূপবতী অরণ্য, লক্ষ্মনাবতী, লোকনাথ ব্রম্ভ্রচারী, শবরীর তীর হতে, শুভেচ্ছা, শেষ নাগ, শেষ প্রহর, শেষাগ্নি, শ্রেষ্ঠ গল্প, সওদাগর, সংঘাত, সপ্তম গোস্বামী, সম্পর্ক, সমুদ্র শঙ্খ, সন্ধ্যাসাগর কূলে, স্বর্ণ মৃগয়া, স্বপ্ন বাসর, স্বপ্নময়ী, স্বপ্ন দিয়ে গড়া, স্বপ্ন নিয়ে, স্বপ্ন সত্য কল্পনা, স্বপ্নের শেষ নেই, সাজানো বাগান, সাধারণ মেয়ে, সামনে সাগর, সাহিত্যের সেরা গল্প, সীমানা, সুখের সময়, সূত্রধর, সূর্য গেল অস্তাচলে, সোনা ফসলের পালা, সোনার হরিণ চাই, সোমনাথ স্মৃতিটুকু থাক, সর্বকালের সেরা ৫০ গল্প, হাতিবোঙার অরণ্য ইত্যাদি।
  • তাঁর কিশোর সাহিত্য গ্রন্থগুলি হল- কেঁচো খুঁড়তে কেউটে, কম্পাদি গ্রেট, কোঁৎকা খেল হোঁৎকা, কম্পা কাহিনি, পঞ্চপান্তর, পটলার গঙ্গাদর্শন, পটলার কান্ডকারখানা, পটলার তীর্থ দর্শন, পটলার তীর্থযাত্রা, পটলার বাঘ শিকার, পটলার গল্প সংগ্রহ, পটলা সমগ্র ( ১ম), প্যালারাম নিরুদ্দেশ, দশ চক্র, দন্ডকারণ্যের গহন, বইভর্তি ভূত ( সংকলন), বুনো ওল বাঘা তেঁতুল, ভীমগড়ের বাঘ, সখের গোয়েন্দা, সোনার চাঁদ, সোনা পাহাড়ে দৈত্য ইত্যাদি।
  • তাঁর লেখা নাট্যগ্রন্থগুলি হল- মেঘে ঢাকা তারা, প্রজাপতি, মসনদ, বুনো ওল বাঘা তেঁতুল, প্যালারাম নিরুদ্দেশ, জীবন কাহিনি, সানাই, মনিবেগম ইত্যাদি।
  • যাঁর লেখার অন্তর্নিহিত উপাদান ঋত্বিক ঘটক, শক্তি সামন্ত, রাজেন তরফদার, ইন্দর সেন, সুজিত গুহ, স্বপন সাহা, হরনাথ চক্রবর্তী, রবি কিনাগী প্রমুখ তীক্ষ্ণধী পরিচালকদের ছবি করতে উৎসাহিত করেছিল, তিনি যে হেলাফেলার লেখক নন একথা বলার প্রয়োজন হয় না। এমনকি তাঁর প্রয়াণের পরেও তাঁর লেখা কাহিনি অবলম্বনে অনেক পরিচালকরা ছবি করতে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। শুধু তাই নয়, কোলকাতার প্রায় সমস্ত প্রথম সারির পুস্তক প্রকাশনী সংস্থাই তাঁর লেখা গ্রন্থ বিভিন্ন সময়ে প্রকাশ করেছেন। তাঁর সৃষ্টির উৎকর্ষতার এটিও একটি জ্বলন্ত প্রমাণ।
  • সাহিত্য ছিল তাঁর কাছে জীবনযাপনের অঙ্গ। পুরস্কার পাওয়া বা না পাওয়া সেখানে গৌন। নব্বই অতিক্রান্ত বয়সেও তাঁর কলমে ছিল অনায়াস গতি যা খুব কমজনই পারেন এবং পেরেছেন। তাঁর লেখা পাঠকদের যদি না ভালো লাগতো এবং তাঁর সৃষ্টির যদি না সাহিত্যমূল্য থাকতো তাহলে কি তিনি নিরবিচ্ছিনভাবে প্রায় পৌনে একশো বছর লিখে যেতে পারতেন? কখনোই না। আধুনিক বাংলা সাহিত্যে তাঁর সৃষ্টির ও প্রতিভার গুরুত্ব বা মূল্য আছে কি নেই সে বিচার সময়ই করবে। কারোর ব্যক্তিগত মতামতে কিছু যায় আসে না।
  • এই স্বনামধন্য সাহিত্যিক ১৯৮২ সাল থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত প্রায় ছয় বছর ‘উল্টোরথ’ ও ‘সিনেমা জগৎ’ নামক দুটি মাসিক পত্রিকার সম্পাদনা করেছিলেন। এছাড়াও সিঁথি থেকে ট্যাবলয়েড আকারের সংবাদ পত্রিকা ‘এই সময়’ এর সম্পাদনা করেন ১৯৯০ থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত। এবং ‘এখনই একদিন’ নামক একটি সংবাদপত্রেরও তিনি সম্পাদনা করেছিলেন ২০০৩ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত।
  • সমসাময়িক অন্যান্য সাহিত্যিকদের তুলনায় এই কিংবদন্তী সাহিত্যসাধক যে কোনও কারণেই হোক কম পুরস্কার পেয়েছেন ঠিকই, কিন্তু তা স্বত্ত্বেও তাঁর প্রাপ্তির ঝুলিটা খুব ছোটো নয়। কৃতিত্বের জন্য পুরস্কার ও সম্মান হিসাবে তিনি পেয়েছেন ‘দক্ষিনী বার্তা’ পুরস্কার, ‘কিশোর ভারতী’ পুরস্কার, All India Lion’s Award, ইন্ডিয়া-বর্মা-নেপাল বেস্ট স্টোরি অ্যাওয়ার্ড, বিমল মিত্র জন্মশতবর্ষ পুরস্কার (২০১১), বিভূতিভুষণ পুরস্কার, শৈলজানন্দ পুরস্কার, The Hall of Fame-Lifetime Achieve Sahitya Bramha Award (2009), অতুল্য ঘোষ স্মৃতি সম্মান ( ২০১৩), ‘অমানুষ’ সিনেমার শ্রেষ্ঠ কাহিনিকার হিসাবে Film Award, সিনেমার শ্রেষ্ঠ কাহিনিকার ও চিত্রনাট্যকার হিসাবে জুলাই ২০১২ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের দেওয়া বিশেষ সম্মান ও অর্থ পুরস্কার, এছাড়াও কলকাতার সিঁথি অঞ্চলে তাঁর বাড়ি ১০, রায়পাড়া বাই লেন-এই রাস্তাটির নাম রাখা হয়েছে ‘শক্তিপদ রাজগুরু সরণি’।
  • সাহিত্যিক সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায় তাঁর সম্পর্কে লিখেছেন, ‘তিনি একজন খ্যাতিমান সাহিত্যিক। জীবনকে কত ভাবে দেখেছেন। তাঁর গল্প নিয়ে যে সব ছবি হয়েছে সব ক’টাই হিট। মধূর ব্যক্তিত্বের মানুষ, দিলখোলা, প্রাণখোলা, গল্প করতে ভালোবাসেন। অতি পরিচ্ছন্ন মন, মনে কোনো সংকীর্নতা নেই। আমার মনে হত-তিনি বোধহয় অরণ্যচারী এক শিব। কোনো আত্মপ্রচার নেই। মূল্যবোধে ভরপুর। তিনি সবকিছুতেই অনেক বড়।’ সাহিত্যিক সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ তাঁর সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘ওনার সব লেখাই সাকসেসফুল-যেটাই লিখেছেন। ওনার লেখা ঋত্বিক ঘটকের ‘মেঘে ঢাকা তারা’ দেখেছি। ওনার সিনেমার গল্প লেখার দারুন হাত ছিল। অসাধারণ ভালো মানুষ সাদাসিদে, সরল। ওরকম সাহিত্যিক আমি দেখিনি। উনি সিনেমার ভালো স্ক্রিপ্ট লিখতেন। সেটা তো সবাই ভালো পারে না। স্ক্রিপ্ট লেখাটা দোষের কিছু নয়। সবাই পারে না। প্রেমেন্দ্র মিত্রও লিখেছেন। শৈলজানন্দও লিখেছেন। ওনার ভালো ছোট গল্প আছে। উনি স্বীকৃত লেখক-প্রতিষ্ঠিত লেখক। নিজের জায়গায় উনি স্বপ্রতিষ্ঠিত। কাজেই ওঁর লেখা কেউ উড়িয়ে দিতে পারবে না বা কারো উড়িয়ে দেবার ক্ষমতা নেই।
  • সাহিত্যিক প্রফুল্ল রায় তাঁর সম্পর্কে বলেছেন যে, ‘অত্যন্ত সজ্জন, হৃদয়বান মানুষ, খুব প্রাণখোলা। নাগরিক চাতুরি ওঁর মধ্যে নেই। ওঁর লেখার আমি একজন অনুরাগী। তাঁর লেখার মধ্যে সারবস্তু যদি না থাকে তাহলে সে রকম লেখা টিকে থাকতে পারে না। তাঁর লেখা এতদিন ধরে ছাপাই হবে না। বাংলা সাহিত্যে, চলচ্চিত্রে ও শিশুসাহিত্যে তাঁর যথেষ্ট অবদান আছে।’
  • সাহিত্যিক ষষ্ঠীপদ চট্টোপাধ্যায় তাঁর সম্পর্কে বলেছেন যে, ‘শক্তিপদ রাজগুরু অত্যন্ত ভালো মানুষ। ওনার লেখাও ভালো। খুব ভালো চিত্রনাট্য লেখেন। কিশোর সাহিত্যে ও বড়দের সাহিত্যে ওনার অবদান আছে।
  • সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় তাঁর সম্পর্কে বলেছেন, ‘উনি খুব পপুলার লোক। খুব জনপ্রিয় লেখক।’
  • সাহিত্যিক অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর সম্পর্কে বলেছেন যে, ‘তাঁর ‘মেঘে ঢাকা তারা’ গল্পটার মধ্যে বিষয় আছে-উদ্বাস্তুদের দুঃখ-বেদনা সবই আছে, ভালো লেখা।’
  • সাহিত্যিক ড. দীপক চন্দ্র তাঁর সম্পর্কে বলেছেন যে, ‘শক্তিদা-র উপন্যাস খুব ভালো লাগে কারন তার ঝরঝরে ভাষা, খুব সাদাসিদে সহজ সরল ভাষা।।… বিশেষ করে প্রেমের বিষয় লিখতে তাঁর কলম খুব পটু মনে হয়। সাধারণ মানুষের কথা বলতে গিয়ে মনে হয় তিনি যেন তাদের সঙ্গে মিশে গিয়ে লিখেছেন।’
  • বাউল সম্রাট পূর্ণদাস তাঁর সম্পর্কে বলেছেন যে, ‘ উনি জয়দেবের মেলায় বাউলদের আখড়ায় যেতেন। উনি বাউলের কথা, সাধনের কথা আলোচনা করতেন। দেহতত্ত্বের নিগূঢ় তত্ত্ব আলোচনা করতে ভালোবাসতেন। ওনার কলকাতার বাড়িতে বহুবার গেছি। বৌদি রান্না করে খাইয়েছেন। আমার কলকাতার বাড়িতে উনি বহুবার এসেছেন। উনি আনন্দময় পুরুষ। উনি বহু বই লিখেছেন। ওনার সিনেমা দেখেছি। যেমন অমানুষ। শক্তিদা মানুষ হিসাবে মানুষের মতো মানুষ। ওনার মধ্যে ক্রোধ কখনো দেখিনি। কাউকে রূঢ় কথা বলতে শুনিনি। ওঁর মধ্যে হিংসার ভাব নেই। ওঁর মতো সৎলোক পাওয়া দুর্লভা।’
  • সাহিত্যিক বুদ্ধদেব গুহ তাঁর সম্পর্কে বলেছেন যে, ‘ শক্তিবাবু অনেক লিখেছেন, ভালো লিখেছেন। ওঁনার ‘অমানুষ’ দেখেছি। … শক্তিবাবু সহজ সরল মানুষ ঋজু চরিত্রের লোক। সাহিত্যের জন্য যেটা দরকার তাঁর সেই গুণ আছে। উনি যে সাহিত্যিক হিসাবে ভালো সেটা তো লিখে প্রমাণ করে দিয়েছেন।’
  • সাহিত্যিক নিমাই ভট্টাচার্য্য তাঁর সম্পর্কে বলেছেন যে, ‘ শক্তিপদ রাজগুরু সাহিত্যিক হিসাবে নিশ্চয় খুব ভালো। জীবনের নানা বৈচিত্র্য তিনি এনেছেন তাঁর উপন্যাসে। সেটি হচ্ছে তাঁর বৈশিষ্ট্য। তাঁর উপন্যাসে উপেক্ষিতদের কথা আছে। ওনার লেখা উত্তম-শর্মিলার ‘অমানুষ’ সিনেমা দেখেছি। শক্তিবাবু খুবই ভদ্রলোক, মানুষ হিসাবে নিপাট ভদ্রলোক।’
  • চলচ্চিত্র পরিচালক হরনাথ চক্রবর্ত্তী তাঁর সম্পর্কে বলেছেন যে, ‘কাজের সূত্রে প্রায়ই তাঁর কাছে যেতাম। এমন নিরহঙ্কার, আটপৌরে, স্বচ্ছ মনের এবং অবাক করা প্রখর স্মৃতিশক্তির অধিকারী আমি আর দেখিনি।’
  • চলচ্চিত্র পরিচালক রাজা সেন তাঁর সম্পর্কে বলেছেন যে, ‘ তাঁর ‘মেঘে ঢাকা তারা’ বাংলা ক্লাসিকের মধ্যে অন্যতম। জীবনকে খুব কাছ থেকে দেখার একটা অদ্ভুত প্রবনতাই তাঁকে এই জায়গা দিয়েছে। তাঁর নিষ্ঠা এবং গল্প বলার কুশলতা এখনকার কলাকুশলীদের কাছে শিক্ষনীয়।
  • সাহিত্য সমালোচক অশ্রুকুমার শিকদার তাঁর সম্পর্কে বলেছেন যে, ‘শক্তিপদ রাজগুরুর নাম বাংলার সাংস্কৃতিক ইতিহাসে উজ্জ্বল হয়ে থাকবে, তার কারণ তাঁর উপন্যাস অবলএমবম্বনে বাংলার কিছু অগ্রনী চিত্রনির্মাতা কালজয়ী ফিল্ম সৃষ্টি করেছেন।’
  • কোনও সাধনায় সিদ্ধি লাভ করাটা বড় কথা নয়। অন্তিমলগ্ন পর্যন্ত নিরবিচ্ছিন্ন সেই সাধনায় নিমগ্ন থাকতে পারাটাই আসল কথা। শক্তিপদ রাজগুরু ছিলেন সেই বিরল সাধকদের একজন। পরম করুনাময় সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের আশীর্বাদের হাত তাঁর মস্তকে স্পর্শ করেছিল বলেই হয়তো তিনি আজীবন সাহিত্য সাধনায় ও জ্ঞানচর্চায় নিজেকে নিমগ্ন রেখে আত্মশুদ্ধি তথা সিদ্ধি লাভ করতে পেরেছিলেন।
  • উত্তম কুমার, সুপ্রিয়া দেবী, অমিতাভ বচ্চন, মিঠুন চক্রবর্ত্তী, প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়, তাপস পাল প্রমুখ খ্যাতনামা অভিনেতা-অভিনেত্রীদের অন্যতম সেরা ছবির এই অসাধারণ কাহিনিকার তথা চিত্রনাট্যকার ‘পঞ্চমুখ’ ছদ্মনামেও বিখ্যাত এবং বিশেষভাবে পরিচিত। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, ‘মহানায়ক উত্তমকুমার অভিনীত ও শক্তি সামন্ত পরিচালিত বাংলা ও হিন্দী ভাষায় নির্মিত ‘অমানুষ’ নামক চলচ্চিত্রটি শক্তিপদ রাজগুরুর লেখা ‘নয়া বসত’ নামক উপন্যাস অবলম্বনে সৃষ্টি হয়েছিল। এই ছবিটির পরিচালনার ব্যাপারে প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার তরুন মজুমদার ও দীনেন গুপ্তর সঙ্গেও কথাবার্তা হয়েছিল। কিন্তু ঘটনাচক্রে এটির পরিচালনার ভার শক্তি সামন্তের হাতে এসে পড়ে। বাংলা ও হিন্দিতে উত্তম কুমার ও শর্মিলা ঠাকুর এই ছবির নায়ক-নায়িকার ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন। সহ অভিনেতা হিসেবে ছিলেন উৎপল দত্ত, অনিল চ্যাটার্জী প্রমুখরা। রাজগুরু ও সামন্ত দুই শক্তির মহাপ্রতিভাশক্তিতে এই ছবির চিত্রনাট্য রচিত হয়েছিল। ১৯৭৪ সালে ছবিটি মুক্তি পায়। শ্রেষ্ঠ কাহিনিকার হিসাবে শ্রীরাজগুরু সে বছর সর্ব ভারতীয় স্তরে ‘Film Fare Award’ পেয়েছিলেন। ১৯৬৮ সালে উত্তম কুমার প্রযোজিত ও অভিনীত ‘ছোটি সি মুলাকাত’ নামক বিপুল ব্যয়ে নির্মিত একটি হিন্দি রঙীন ছবি মুক্তি পেয়েছিল। ছবিটি বক্স অফিসে তেমন সাড়া ফেলতে পারে নি; ফলে উত্তম কুমার যেমন বৃহৎ আর্থিক ক্ষতির সম্মুখিন হয়েছিলেন তেমনই হিন্দি ছবির দর্শকরাও তাঁর থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল। এর প্রায় ছয় –সাত বৎসর পরে উত্তম কুমার যখন হিন্দিতে অমানুষ করলেন তখন সর্বভারতীয় স্তরে কি প্রতিক্রিয়া হয়েছিল তা সম্পর্কে শ্রীরাজগুরু বলেছেন যে, ‘পুজোর আগে মুক্তি পেল অমানুষ, তারপর দর্শকদের চিত্ত জয় করে নিল। ‘হাউসফুল বোর্ড’ ঝুলতেই থাকে। … হিন্দি অমানুষও বোম্বে কেন সারা ভারতে সাড়া জাগাল। যে উত্তম কুমারকে হিন্দি দর্শক ছোটি সি মুলাকাতে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল, তারাই অমানুষে তাঁকে বরণ করে নিলেন। সারা ভারতবর্ষ তাঁকে অন্যতম শ্রেষ্ঠ অভিনেতার সম্মান জানাল।’ এই উপন্যাসটি ইংরাজীতে কথারন্তিত হয়ে বিদেশের বাজারেও সমাদৃত হয়। আবার তামিল ভাষায় ‘ত্যাগম’ এবং মালয়ালম ভাষায় ‘ইকি উরি মনুষ্যান’ নামে এটি পুননির্মিত হয়েছিল। ‘অমানুষ’ যেমন উত্তম কুমারের অন্যতম সেরা ছবিগুলির একটি, তেমনই সুপ্রিয়াদেবীর ‘মেঘে ঢাকা তারা’, অমিতাভ বচ্চনের ‘অনুসন্ধান’, মিঠুন চক্রবর্ত্তীর ‘অন্যায় অবিচার’, ‘অন্ধবিচার’ প্রসেনজিতের ‘আশা ও ভালোবাসা’, ‘আমার তুমি’, ‘মা’, ‘স্বপ্ন’, তাপস পালের ‘অন্তরঙ্গ’, ‘বলিদান’, ‘অন্তরের ভালোবাসা’, ‘লালপাহাড়ি’, ইত্যাদি ছবিগুলিও উক্ত অভিনেতা-অভিনেত্রীদের বিশেষ উল্লেখযোগ্য ছবি। সবচেয়ে বড় কথা হলো উল্লেখিত সমস্ত ছবিগুলিই শক্তিপদ রাজগুরুর কাহিনি অথবা চিত্রনাট্য দ্বারা নির্মিত হয়েছে।
  • বাংলা তথা সর্বভারতীয় কথা সাহিত্য ও চলচ্চিত্রের এই মহাপ্রতিভাবান কিংবদন্তী ব্যক্তিত্ব ১২ই জুন, ২০১৪ সালে ৯২ বৎসর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। স্রষ্টার মৃত্যু হয় না। তাই ভারতীয় সাহিত্য-সংস্কৃতির ইতিহাসে তাঁর নাম চিরদিনের জন্য স্বর্নাক্ষরে লেখা থাকবে। এ কথা আর বলার অপেক্ষা থাকে না।
  • তথ্যঋণ
  • ১) কথাসাহিত্যে ও চলচ্চিত্রে শক্তিপদ রাজগুরুঃ স্রষ্টা ও সৃষ্টি, লেখক নিতাই নাগ, প্রকাশক-সাহিত্যলোক
  • ২) মেঘে ঢাকা তারা ( উপন্যাস), শক্তিপদ রাজগুরু, দে’জ পাবলিশিং
  • ৩) আজকের নায়ক ( উপন্যাস),শক্তিপদ রাজগুরু, প্রকাশক- বর্নালী
  • ৪) জনপদ ( উপন্যাস), শক্তিপদ রাজগুরু, প্রকাশক- দে’জ পাবলিশিং
  • ৫) দেশ ( পাক্ষিক সাহিত্যপত্র) ২ রা জুলাই, ২০১৪
  • ৬) তথ্যকেন্দ্র ( মাসিক সাহিত্যপত্র) ১লা জুলাই, ২০১৪
  • ৭) নিউজ বাংলা ( শারদীয়া-১৪১৯ সংখ্যা )
  • ৮) শারদাঞ্জলী ( শারদীয়া-১৪২০ সংখ্যা )
  • ৯) সময়-অসময় ( শারদীয়া-১৪১৯ সংখ্যা)
  • ১০) শারদীয়া কিশোর ভারতী ১৪১৬ সংখ্যা
  • ১১) বাংলার সমৃদ্ধ অঙ্গন ( ১লা এপ্রিল-৩০শে জুন ২০১০) সংখ্যা
  • ১২) গ্রামোন্নয়ন বার্তা –জানুয়ারী-মার্চ ২০১৪ সংখ্যা
  • ১৩) দে’জ পাবলিশিং- এর বুকলিস্ট মে, ২০১৪ সংখ্যা

 

 

 

 

 

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here