গল্প হলেও সত্যিঃ নার্সরূপেণ সংস্থিতা // স্বর্নালী নস্কর

0
392

নার্সরূপেণ সংস্থিতা

 স্বর্নালী নস্কর  

শহর জুড়ে এখন বাঁশের মরশুম!!! রাস্তা জুড়ে বাঁশের খাঁচা তৈরী। আর মাত্র কয়েকদিন, তারপরই বিজ্ঞাপনের হোর্ডিং-র আড়ালে ঢাকা পড়ে যাবে শহরের রাস্তা আর ফুটপাতের চোখে চোখ রাখা প্রেমের নীরব কাহিনী।

অথচ হাসপাতালের চেঞ্জিংরুমগুলো সরগরম পূজা রোস্টারের গল্পে। আগামী এক দু দিনের মধ্যেই লক্ষ্মীপূজা পর্যন্ত ডিউটি রোস্টার জমা পড়ে যাবে। এই আলোচোনর মাঝে ফিকে হয়ে যাচ্ছে পে কমিশনের পাওয়া না পাওয়ার তথ্য ।কে পেলো ছুটি!!! ক’দিন পেলো!!! কবে কবে পেলো!!!! নিজের সাথে অন্যের রোস্টার সবটাই জানতে হবে। ট্রায়াল রুমে জামা ফিটিংসের থেকেও বেশি গুরুত্বপূর্ণ রাফ রোস্টার এক ঝলক দেখা। রোস্টার সাইন হয়ে গেলে তারপর তার বদল করা প্রায় অসম্ভব!!! এদিকে কোনো কোনো ওয়ার্ডে সিস্টার ইন চার্জ উদারপন্থী। সেসব ওয়ার্ডে রাফ রোস্টার “খোলা হাওয়ায়” ঘুরছে, সবাই দেখছে, ডিউটি এক্সচেঞ্জ করছে। আর কোনো কোনো সিস্টার ইন চার্জ রক্ষণশীল, সেসব ওয়ার্ডের স্টাফেরা অপেক্ষা করছে “ভেঙে মোর ঘরের চাবি” কবে সিস্টার রাফ রোস্টার দেখাবেন। বন্ধু ,পরিবার ফোনে পূজা প্ল্যানিং জানাচ্ছে। আমরা বিরসবদনে বলছি “থোড়ি দের অর রুক যা”। উফ, কি টেনশান!!! কেউ হাসলে মনে হচ্ছে, নিশ্চয়ই ও সব পছন্দ মাফিক ছুটি পেয়েছে। সিস্টার গোপনে ওকে জানিয়েছে।

এদিকে পেপারে বলছে দুই থেকে পনেরো টানা পূজোর ছুটি। সদ্য বিবাহীতা নার্স কিছুতেই বরকে বোঝাতে পারছে না, এসব কাগজে কলমে ছুটি বাস্তবে আমরা পাই না। যেমন ঐ সবাই বলছে আড়াই গুন মাইনে বেড়েছে। আসলে যে গল্পটা কি সেটা শুধু আমরাই বুঝছি। যাক গে, যা বলছিলাম। তারপর সদ্য প্রেমে পড়া নার্সটি এসে সিনিয়ার দিদিকে চুপিচুপি বলছে, প্রেমিকের সাথে অষ্টমীর সারারাত ঠাকুর দেখার প্ল্যানিং। যদি দিদি তার সাথে ডিউটি অ্যাডজাস্ট করেন। কিম্বা পূজার পরেই বিয়ের পিঁড়িতে বসার দিনক্ষণ ঠিক করা নার্সটি কিছুতেই দশমীর ডিউটি করতে পারবে না। হবু শ্বশুরবাড়ির বাড়ির পূজায় সিঁদুরখেলাতে তাকে থাকতেই হবে। সে ডিউটি মিউচ্যুয়াল করার কাউকে পাচ্ছে না। আবার স্বামী স্ত্রী দুজনেই ইমার্জেন্সি ডিউটিরত নার্স দিদির কপালে ভাঁজ। এবার পূজাতে নাইট । তাঁর স্বামীও ব্যস্ত থাকবেন পূজার আনন্দে মাতোয়ারা শহরে মানুষকে পরিষেবা দিতে। বাড়িতে বাচ্চাটি কার কাছে থাকবে?! আবার কাজের দিদিই বল ভরসা এমন মা নার্সদের কাকুতি মিনতি সেই দিদিকে, সপ্তমীটা তুমি এসো দিদি। আমি অষ্টমীটা ম্যানেজ করে নেবো।ঐ দিকে সিনিয়ার দিদির সাথে ঠাকুরমশাইয়ের ফোনেই তুমুল বাকবিতন্ডা। দিদির লক্ষ্মীপূজাতে নাইট। ঠাকুরমশাই কিছুতেই আগে আসতে পারবেন না। দিদির অনুরোধ রাগে বদলে গেছে, দিদি তো পূজাটা সেরে তবেই নাইটে আসবে।

কি ভাবছেন আপনারা!!!! আমাদের প্রি-পূজার বহু টুকরো ছবির সামান্য কয়েকটার কোলাজের কিছুটা মাত্র বর্ণনা করলাম। বাকি থেকে গেলে ছোট বাচ্চার কান্না শুনেও না শোনা মা নার্সের কথা। সদ্য কৈশরে পা দিয়ে সারারাত ঠাকুর দেখা নিয়ে সন্তানের সাথে কলহরত, চিন্তারত মা নার্সের কথা। গর্ভবতী অবস্থায় এই ভিড়ময় শহরে কিভাবে ডিউটি আসবে সেই চিন্তায় কাতর নার্সের কথা। বাড়িতে সমস্ত দায় দায়িত্ব পালন করে নিজের জন্য এখনো কোনো কিছু না কেনা ,ঠাকুর না দেখা পণ করা সেই আপাত কঠিন নার্সের কথা।এমন অনেককক বাকি থাকা বাকিই থাক।

আনন্দময় হোক আপনাদের উত্সবের দিনগুলো। সুস্থ থাকুন আমরা আপনারা, আমাদের কাছের দূরের চেনা অচেনা সবাই , সবসময়। তবুও আমরা থাকছি, হাসপাতালে, নার্সিংহোমে। আপনাদের প্রিয়জনদের অসুস্থতায় পূর্ণ পরিষেবা দেওয়ার জন্য। আনন্দমুখর রাজ্যের সমস্ত প্রান্তে থাকছি আমরা……. নার্সরূপেণ সংস্থিতা!!!!

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here