গল্পঃ রোদপাল্কি // শাশ্বতী চ্যাটার্জী

0
35

রোদপাল্কি

                         শাশ্বতী চ্যাটার্জী

কেমন এক অন্ধকার রঙের শাড়ি পরতো শ্যামলীদি।

গলায় কণ্ঠী, বাঁহাতে স্টিলের নোয়া,খড়ি ওঠা আদল, কেতার্থ হাসিমাখা সাঁঝসকাল। 

তার বয়েস, না, কেউ জানে না। উনুনে আঁচ পড়লো কি না তার খবরও রাখত না কেউ। আধখামচা গেরস্থালি, উড়নচণ্ডী খ্যাপা এক ভাই আর ঘুপচি একানে ঘরের কোলে আটফাটা দাওয়া নিয়ে ছিল তার একপেশে রোজনামচা। পুরো এগারো ক্লাস অবদি পড়া তার। কি যেন ছোটখাটো একটা কাজ করত সে, যার জন্য অনেকটা লম্বা রাস্তা পেরোতে হ’ত তাকে, খানাখন্দময়, এবড়োখেবড়ো। আর তার বাকি কাজ বলতে ছিল ভাইকে সারিয়ে তোলার জন্যে অগণিত তাবিজ কবচ মাদুলি জলপড়া তেলপড়ার খোঁজ আর তার জোগাড়।

       কাঠকয়লার ধোঁয়া গিলতে গিলতে সকাল আর অজস্র গতিময় খুরের আঘাতে উড়ে চলা পৃথিবীর যাবতীয় ধুলোমাটি মাখতে মাখতে বিকেল আসত তার শরীর জুড়ে। মাঝযৌবনেই ত্বকে লাবণ্যের অসময়ের খরা, ঘাড়ের কৌণিক দূরত্বে রূপোলি রেখা,অমসৃণ বাদামী আঙুল আর ফ্যাকাশে ওষ্ঠাধর নিয়ে সে ছিল তাবৎ খবরের বাইরে।

      শ্যামলীদি সাধারণ, খুব খুব সাধারণ। তাকে ঘিরে কখনোই কোনো গল্প হয় না, রোমাঞ্চ হয় না, রহস্য হয় না, কবিতার গড়ন দানা বাঁধে না,কানাঘুষো হয় না, এমন কি সন্দেহও হয় না, আর ভালোবাসা! সে তো হয়ই না।

       শ্যামলীদি কোনোদিন টুকটুকে লাল আপেল খায় নি, পাউডার কিনে মাখে নি,নরম তোয়ালে দিয়ে  মুখ মোছে নি, শপিং মলে ঢোকে নি আর একান্ত পুরুষের সঙ্গে গল্পও করে নি। তুমি বলবে, সে তো অনেকেই করে নি, এ আর এমন কি! আমি বলব,কিন্তু অনেকেই তো সে সব করেওছে! কিন্তু শ্যামলীদি করে নি। কেন করে নি, অভাবে না স্বভাবে, স্বেচ্ছায় না চাপে পড়ে, নিজের অযোগ্যতায় না কি মন্দ কপালের জেরে, সেসব গল্প শ্যামলীদির ক্ষেত্রে অবান্তর; কেউ শুনতেও চাইবে না।

         তবু শ্যামলীদি বলেছিল কিছু। সেটাও আবার আমাকে। বলেছিলর থেকে বলা ভালো, চেয়েছিল। আমার কাছে। তখন আমি সদ্য কলেজ পাশ দেওয়া তকতকে যুবক। মেদহীন গৌর শরীর, মাথাভর্তি ঝাঁকড়া বাদামী চুল,অতিশয় সচ্ছল পরিবারের দুধ ঘি মাছ মাখন খাওয়া নালিশহীন পালিশ করা স্বাস্থ্য। খেলাধুলো, ট্রেকিং, সাঁতার সবেতেই নাম হয়েছে দুর্দান্ত। পাশে থাকত স্বপ্নে দেখা রাজকন্যে, রীতিমতো ঈর্ষা করার মতো প্রেমিকা, অপর্ণা। আর ছিল অগুণতি নাম না জানা ভক্তবৃন্দা। জীবনকে তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করছিলাম বেশ কিছুদিন থেকেই।

         সেদিন অপর্ণাকে পক্ষীরাজ থেকে নামিয়ে দিয়ে ফেরার পথে ভবঘুরোর মোড়ের মাথায় হাত দেখিয়ে আমাকে দাঁড় করালো শ্যামলীদি। সরাসরি বলল, ‘বিভাস! জ্যোতিষগুরু কথাটা বলেছিলেন। তার সঙ্গে কদিন ধরেই তার স্বপ্নও দেখছি রে! ঐ আমাদের মেঘসই-এর শাওনমিতার জঙ্গল থেকে রোদপাল্কি ফুলের রস এনে খাওয়ালে আমার অঘোর ঠিক হয়ে যাবে রে!’ (অঘোর শ্যামলীদির মানসিক প্রতিবন্ধী ভাই; যার পাগলামির অত্যাচারের চিহ্ন শ্যামলীদি প্রায়ই বয়ে বেড়ায়। তখনও গালে হাতের কবজিতে খিমচানোর দাগ স্পষ্ট।) আমি একটু হকচকিয়ে গেলাম। অমন ফুলের নাম তো শুনিনি! তার আবার রস! মেঘসই আমাদের টাউন থেকে মাইল কুড়ি দূরের পাহাড়। শাওনমিতা তার সবুজ জঙ্গুলে উপত্যকা।

         এক রোববারের সকাল সাড়ে ছটায় বেরোলাম। অত ভোরে, কারণ, দুপুর একটার শোয়ে অপর্ণাকে ছবি দেখাতে নিয়ে যেতে হবে। পক্ষীরাজে আমার পেছনে অনভ্যস্ত শ্যামলীদি, বুঝতে পারছিলাম বেশ অসুবিধে হচ্ছে। বললাম, ঠিক আছে। আমাকে ধরে বোসো। খুব আলগোছে, আমার কাঁধে শুধু প্রায় আঙুল ঠেকিয়ে সন্তর্পণে এবং সসঙ্কোচে বসল সে। মনে পড়ে গেল, অপর্ণা কিভাবে তৃষ্ণার্ত সাপিনীর মতো আষ্টেপৃষ্টে আমাকে প্রায় পেঁচিয়ে বসে ঠিক ঐ সিটটাতেই; যেন গোগ্রাসে…যাই হোক, অবান্তর প্রসঙ্গ থাক।

         শাওনমিতায় পৌঁছলাম সাতটার দুমিনিট আগেই। ঘন জঙ্গল নয়; একটু ছাড়া ছাড়া বেশ কিছু বনস্পতি,অজস্র লতাগুল্ম আর কিছু সংখ্যক দুষ্প্রাপ্য ফুলের গাছ। কি সুন্দর ওদের নাম! আনচুম্পি, বৃন্তবতী, শিশিরধারা,মধুপান্থ, গোধূমবর্ণা,মিলিতা, সন্ধ্যাদুরী, নিশিমিত্রা, … আরো কত কী! এর মধ্যে শ্যামলীদির স্বপ্নে দেখা রোদপাল্কি কোনটা! সদ্য বর্ষা পেরনো বনভূমি; সদ্যস্নাত পূর্ণযৌবনা। “সোনার তৈরি ঝিনুকের মতো দেখতে রে! বুকে লাল আছে।” ভারী মুশকিল!

         ঘন্টাদেড়েক দুজনে মিলে বেশ খোঁজাখুঁজি চলল। সোনার ঝিনুকের দেখা নেই। বুঝতে পারছিলাম, চড়াই উতরাইতে সে বেশ হাঁফিয়ে উঠেছে। হাত ধরতে বললেও বেশির ভাগ ধরছে না। একটা পাথরের ওপর বসালাম। জলের বোতল এগিয়ে দিলাম। ছিপি খুলে ঢকঢক করে কিছুটা খেয়ে মাথা নীচু করে বসে রইলো। বলল, “তোকে বড়ো কষ্ট দিলাম রে বিভাস! চল, এবার ফিরি।” হাওয়া বইছিল, ফুলের গন্ধ মিলেমিশে কি স্নিগ্ধ তার আবেশ! ভেজা বনের আলোছায়ায় সাদাকালো শ্যামলীদি। কব্জির ক্ষতটা বেশ দগদগে। গালের পাশে একটা নতুন আঁচড়ের দাগ। প্রকৃতির উদার দানশীলতায় উপচে যাওয়া পূর্ণ এক নন্দনকাননের মাঝে একমুঠো শূন্যতা,যার ফুলের রঙ রূপ গন্ধ নেবার মতো মানসিকতাটাই কোথায় যেন নিরুদ্দেশ হয়ে গেছে। মনের ভেতরটা হু হু করে উঠলো। বললাম, “কাছেই তো রূপছোঁয়া ঝোরা! চান করবে শ্যামলীদি?” চমকে উঠলো প্রস্তাবটা পেয়ে। কত বছরের অযত্নে শুকিয়ে যাওয়া বেরঙ গাল দুটোয় কি  কোনো আশ্চর্য অজানা আভা ছড়িয়ে মিলিয়ে গেল! “তুই কী খেপেছিস বিভাস?” বলে তড়িঘড়ি উঠে দাঁড়ালো। এই প্রথম আমি নিজে কাউকে জোর করলাম। তা না হ’লে, মেয়েদের কাকুতি আকুতি আমিই পেয়ে অভ্যস্ত। ” দাঁড়াও, এখন আমরা ফিরব না। সারাদিন থাকব পাহাড়ে। ঘুরব, মজা করব, অনেক গল্প করব। দুপুরে আদিবাসীদের আড্ডায় নিয়ে গিয়ে তোমাকে লাল চালের ভাত আর মুরগীর ঝোল খাওয়াব গরম গরম। সূয্যিডোবা দেখে তবে ফিরব। অঘোরদা জন্যে চিন্তা কোরো না, আমাদের বাড়ির ভোলাদাকে ফোন করে দিচ্ছি, ওর খাবার দিয়ে আসবে’খন।” কেমন হতবাক দাঁড়িয়েছিল শ্যামলীদি। “তোর যে অপর্ণার সঙ্গে সিনেমা…” থামিয়ে দিয়ে বললাম, ‘আর একদিন দেখা যাবে। এখন চলো; ঝরণার ও ধারটা ঘুরে আসি।’শক্ত মুঠিতে হাতটা ধরলাম। ঠাণ্ডা শক্ত নির্জীব আঙুল, এক মিনিট ধরতেই বেশ উষ্ণ হয়ে উঠলো।

          আমরা হাঁটছি পাশাপাশি। বসছি। হাসছি। বলছি। আলোছায়ার খেলায় মায়াময় পাহাড়ি অরণ্য মিলেমিশে ঢলে পড়ছে,গলে পড়ছে দুটি ভিন্ন ভিন্ন গ্রহের প্রাণীর অমলিন আনন্দে। শ্যামলীদি যে এত জোরে হাসতে পারে জানা ছিল না! ওর হাসির দমকে, চোখের আলোয় দেখলাম, আশপাশের সমস্ত গাছগুলোয় কী এক অত্যাশ্চর্য ফুল ফুটে উঠছে! ঠিক সোনার ঝিনুকের মতো! বুকে লাল…!

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here