শব্দঃ জন্ম ও মৃত্যু/৩ / কেতা // জয়কৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়

0
134

ধারাবাহিক

শব্দঃ জন্ম ও মৃত্যু

আজকের শব্দ — কেতা

জয়কৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়

“কালে ঠিয়া মি নে নে লি

রাদিন মি ন ল ভাবে লি”

ঘটনাটা জানেন অনেকে। অবশ্য জানেনও না অনেকেই। এখন আমি মোল্লা নাসিরুদ্দিন নই যে বলব, “যাঁরা জানেন না তাঁরা, যাঁরা জানেন তাঁদের কাছে জেনে নিন”। আর তাছাড়া এই ফেনিয়ে বলাটাই আমার “কেতা”!

যতদূর মনে পড়ে, সাহিত্য রবিবাসর নামে একটা পত্রিকায় পড়েছিলাম শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের জীবনের এই ঘটনাটি। ঘটনাটি এরকম যে, কোনও এক কালোয়াতি গানের অনুষ্ঠানে উনি অতিথী হিসেবে আমন্ত্রিত। বেশ চলছে অনুষ্ঠান। হঠাৎ অনুরোধ ওনাকে আরবী ভাষায় একটা গান শোনাতে হবে। কেউ মানতেই চায় না যে উনি আরবী জানেন না। কি আর করা! অগত্যা মদনমোহন তর্কালঙ্কারের শরণাপন্ন। “সকালে উঠিয়া আমি মনে মনে বলি…” থেকে শুধু প্রথম অক্ষরটুকু বাদ! এই না হলে “কেতা”!

গল্পটি যদি ভুল-টুল হয়ে থাকে, তো পাঠক যেন মাফ করেন। অবশ্য কোমল হৃদয়া পাঠিকারা যে করবেন সে বিশ্বাস আমার দৃঢ়! তো সে যা হোক, এখন এই ধারাবাহিকের কেতা অনুযায়ী এবারের শব্দ আবশ্যিক ভাবেই “কেতা”। আর মোল্লা না হওয়ায় আমার দৌড় মসজিদ পর্যন্তও নয় যে “আলিফ” “বে” “তে” শিখে নেব! সে চেষ্টাও অবশ্য হয়েছিল এককালে। বেশ সুর্মা আর “ইত্ত্বর” এর লোভে আরবি বর্ণমালা শেষ করে প্রথম পাঠ, ফ্রেঞ্চ শিখব বলে কবিতা পাঠ, আর “ম্যাইন খ্যাম্ফ” পড়ার জন্য “দয়েচ” এসব পাগলামী। সাথে দ্বিভাষিক অভিধানও বেশ কয়টি। কিন্তু মুজতবা আলী সাহেবও ইদানিং বেহেস্তে থাকায় ও পর্বে ইতি!

তবে কেতা আলোচনা করতে গিয়ে মনে হল, সুনীতিবাবুর কোনও নীতি নেই। না হলে কেউ “Origin and development of the Bengali language” কি আর ইংরেজি ভাষায় লেখেন! হতেন এই যুগে, নীতিবোধ শিখিয়ে দিতেম! অবশ্য উল্টোটাও হতে পারত। উনি বেশ সাগরপারে শিক্ষাচর্চা করে ডলারে মুগ্ধ হতেন, আর আমরা ওনার বাঙালিয়ানায়! এই আলোচনায় এই প্রসঙ্গ প্রাসঙ্গিক, কারণ এই সময়ের এইটিই “কেতা”।

প্রাচ্যদেশ থেকে তখন একদল মানুষ এসে দখল করেছেন এই দেশ। আর সবাইয়ের মত তরোয়ালের ডগায় শান্তির বাণী প্রচারও করেছেন। এবং যথাবিধি শাসনকার্য ও ধর্ম প্রচারের প্রয়োজনে শিক্ষা বিস্তারেও বাধ্য হয়েছেন। এদেশের কিছু মানুষ বেশ শিখেও নিয়েছেন নতুন ভাষাদুটি। আরবী, ফার্সী। কিন্তু যেমন হয়, প্রতিবেশীর সাথে ঝগড়াও হয়, হয় ভাব-ভালোবাসাও। সুতরাং পাশের বাড়ির ছোট ছেলের মতই কিছু শব্দ চলে এলো বাংলার উঠানে। তারই একটি “কতা” উর্ফ “কেতা”।

“কতা” নিখাদ আরবী শব্দ। অর্থ খণ্ড। আবার সাজিয়ে রাখাও। কারণ সাজিয়ে রাখতে খণ্ড করতে হয় বই কি! তো এই সাজিয়ে রাখার কায়দাটিও কিন্তু কেতা! “কেতা” “কতা”র অপত্য। (প্রথম, দ্বিতীয় বা তৃতীয়, কোন লিঙ্গ তা তো আর সব শব্দে বোঝা যায় না! তাই অপত্য বলাই শ্রেয়!) কি জানি, কারও কারও তো মত “কেতাব”ও নাকি “কেতা”রই ভাই-বোন কিছু!

কিন্তু ব্যবহার করলেই হল! ব্যাটা বিধর্মী শব্দ। গোবরজল না খাওয়ালে হবে! আর অপরের সম্পদ যুক্তি-টুক্তি দিয়ে নিজেদের দাবী করাটাও যে আবার সকল গোষ্ঠীরই “কেতা”। “কেত” মারা তবেই না সার্থক! সুতরাং, “কিৎ” ধাতুর সাথে “অ” প্রত্যয়ে সাধিত “কেত” যা মূলতঃ পতাকা বা নিশান বোঝায়, বিশেষ অর্থে স্থানও, তার বিশেষ অপ্রচলিত অর্থ “চিহ্ন”কে মুচড়ে “আ” প্রত্যয়ে প্রত্যয়িত করে “ধরণ” করে নেওয়া হল, যা কিনা প্রয়োজনে “ঢং” অর্থেও ব্যবহার করা যায়।

হুতোম কি “কলকেতা” বলতেন কথ্য ভাষার প্রভাবে না “কল”(যান্ত্রিক) “কেতা”(ধরণ) যার বোঝাতে? কে জানে? নইলে “কেতা” নিয়ে অত পান(pun) করলেন কেন? রীতিমতো পানদোষ! “ফিকির” অর্থেও “কেতা” ব্যবহারের কেতা তো ওনার নক্সাতেই। কিন্তু সঙ্কোচের নিয়মেই কেতা টঙের থেকে নেমে এসে মূলতঃ “ঢং” অর্থে থিতু হল। অবশ্য আজকাল অপ্রয়োজনীয়কেই “টঙে” তুলে রাখার বিধি!   (চলবে)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here