অণুগল্পঃ বাদল বই হতে পারতো / নিবেদিতা বিশ্বাস

0
134

বাদল বই হতে পারতো

নিবেদিতা বিশ্বাস

বাদল বই হতে পারতো। কিন্তু পড়তে পারতো না। ছেলেবেলায় বাবা মারা গিয়েছিল, মা তাকে কোলে নিয়ে শহরে চলে আসে অসিত কাকুর অত্যাচারে, সেখানে একটা বাড়িতে ফাইফরমাশ খাটার জন্য বাদলকে দিয়ে দেয়। নিজেও কাছেই আরেক বাড়িতে সবসময়ের কাজের জন্য ঢুকে যায়! সে বাড়িতে ছেলেকে নিয়ে থাকা যাবেনা, অগত্যা বাদলকে অন্য বাড়িতে দেওয়া!

বাদলের আট বছর বয়স। যে বাড়িতে থাকে সেই বাড়ির মালিক চাকরিতে চলে গেলে মালকিন ও তার ছোট মেয়ের ফাইফরমাশ খাটাই বাদলের কাজ।

বাড়ির কাছেই একটা স্কুলে মেয়েটি পড়ে।

তিতলি নাম মেয়েটির। তিতলিকে স্কুলে দিয়ে সেখানেই বসে থেকে এক্কেবারে ছুটি হলে বাড়ি ফেরার কাজটাই বাদলের প্রধান।

মালিক মালকিন দয়ালু স্বভাবের, তেমন চাপ দেন না, ওর পড়ার কথাও বলেন। কিন্তু বাদলের খুব ভয় করে, কিছু চাইতে, এতদিন কোন কিছু চেয়েই না পাওয়াটাই তার কাছে স্বাভাবিক। তাই চুপ করে থাকে সে।

একদিন স্কুলের কাছে গিয়ে তিতলি চিৎকার করে কাঁদতে থাকে। হঠাৎ এমন পরিস্থিতিতে ভ্যাবাচাকা খেয়ে যায় বাদল। বারবার জিজ্ঞাসা করে কি হয়েছে, অনেকক্ষণ পর তিতলি জানায় সে অঙ্কের বই আনেনি, অঙ্ক স্যার খুব রাগী। নিশ্চয়ই খুব বকবেন।

বাদল মুচকি হেসে বলে সে তিতলিকে বই এনে দেবে কিন্তু ততক্ষণ তিতলি বাদলকে দেখতে পাবেনা, আর বইটা ব্যাগে ভরে ব্যাগটা যেন পুরো আটকে না দেয় তিতলি।

তিতলি রাজি হয়। বাদল বই হয়ে যায়! ব্যাপারটাই তিতলির কাছে মজাদার হয়ে ওঠে। সযত্নে বই নিয়ে সে ক্লাসে চলে যায়, ক্লাসে থাকার জন্য বাদলেরও অনেক কিছু শেখা হয়ে যায়।

এরপর ছুটি হলে গাছতলায় এসে তিতলি বই বের করে পাশে রাখে, আর কিছুক্ষণের মধ্যেই বাদল আবার বাদল হয়ে যায়।

এইভাবেও লেখাপড়া শেখা যাবে এটা ভেবে বাদল তিতলিকে প্রতিদিন বই হয়ে ক্লাসে যাওয়ার কথা বলে, তিতলি রাজি হয়ে যায়।

বাড়িতে তিতলির মা পড়াতে বসালে বাদল অনেক প্রশ্নের উত্তর দিয়ে দেয়, তিতলির মা অবাক হন। আবার বাদলকে পড়তে বলেন, কিন্তু বাদল কিছু বলেনা, ভয় পায়।

স্কুল ছাড়াও প্রতিদিন দুপুরবেলা যখন মা ঘুমাতেন তখন তিতলির দাবী মতো বাদলকে হতে হোতো ছড়ার, ছবির, গল্পের বই। মন দিয়ে সেই বইগুলো নাড়াচাড়া করতো সে। দূর থেকে কখনওবা মা দেখে ভাবতেন মেয়ের বই পড়ার নেশা তার বাবার থেকেই পাওয়া।

বেশ কিছুদিনের জন্য তিতলির বাবা অফিসের কাজের জন্য বাইরে গেছেন। এমনই এক মন খারাপ করা দুপুরে তিতলি বায়না ধরে একখানা ছবির বই হতে হবে যার মলাটে সবুজ গাছের ছবি, ভিতরে নীল নদীর ছবি, প্রজাপতি, সবুজ ঘাস আর হরিণের ছবি থাকতে হবে।

বাদল আবার বই হয়। বই নিয়ে দেখতে দেখতেই হঠাৎ বাইরের ঘরে বাবার গলার আওয়াজ শুনে ছুট্টে যায় তিতলি, বাবা মেয়ের গল্প শুরু হয়, মা হাসিমুখে সরে এসে পড়ার ঘরটা গোছাতে থাকেন। একটা সবুজ গাছের ছবি দেওয়া মলাটের বই চোখে পড়ে তাঁর। এতসুন্দর বই দেখে কাচের আলমারিতে তুলে দেন পাল্লা বন্ধ করে।

দুপুর গড়িয়ে বিকেল, বিকেল থেকে সন্ধ্যে, বাদলের খোঁজ করেন বাবা। এক ছুট্টে পড়ার ঘরে যায়, তন্ন তন্ন করেও খুঁজে পায়না বাদলকে, মাকে জিজ্ঞাসা করে বইটার কথা, মা আলমারি থেকে বের করে দেন।ততক্ষণে বইয়ের সবুজ গাছ হলুদ, নীল নদী জলহীন প্রজাপতি, হরিণ মৃত, সবুজ ঘাস বিবর্ণ রূপ ধারণ করে, শুধুমাত্র তিতলি তা দেখতে পায়, কারণ সবাই তখন বাদলকে খুঁজতে ব্যস্ত! থানা-পুলিশ, পাড়া প্রতিবেশি, বিজ্ঞাপন কোনোভাবেই আর বাদলকে পাওয়া যায়না।

তিতলিও ঐ বইটি হাতে নিয়ে কেবলই বলতে থাকে বাদল বই হয়ে গেছে!

সর্বক্ষণের বই পড়ার সঙ্গী বাদলকে হারিয়ে গভীরভাবে শোক পেয়েই যে একথা বলছে তিতলি তা তার বাবা-মায়ের বুঝতে বাকি থাকেনা।

তিতলিকে তারা মনোবিদের কাছে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

বাদল আর ফেরেনা!বাদল আর বই হয়না।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here