অণুগল্পঃ রিং টোন / সুচরিতা চক্রবর্তী

0
159

রিং টোন

সুচরিতা চক্রবর্তী

ড্রাইভার দাদা এতো জোর গাড়ী চালাচ্ছো কেনো? সিগন্যাল মানছো না, কি যাতা গাড়ী চালোচ্ছো? বাসে এতো লোক কি প্রাণে মারা যাবো তোমার জন্য? আরে ও কন্ডাকটর ভাই কি হচ্ছে এসব! আস্তে গাড়ী চালাও। আর রাস্তাও তো চিনতে পারছি না, কোন রুটে চলছে বাস? কি আশ্চর্য কারো কোনো হেলদোল নেই দেখছি। কন্ডাকটর এমন চুপ মেরে দাড়িয়ে আছে কেনো! ড্রাইভার একবার ডানদিক একবার বাঁদিকে প্রাণপণ স্টিয়ারিং ঘোরাচ্ছে। না আজ কিছু একটা হবেই, বাড়িতে ফোনে জানিয়ে দি একটা।

হ্যালো বুড়ি মাসি অপুর বাবা ফিরেছে? দাও তো একটু। হ্যালো শুনতে পারছো? বুড়ি মাসি কি হয়েছে? কে কাঁদছে ঘরে? বুড়ি মাসি শুনতে পারছো? কি হয়েছে? কে কাঁদছে গো? অপুর বাবাকে দাও না, আমার ও খুব বিপদ, বাস থামছে না, প্রচন্ডভাবে স্পিড বাড়িয়ে ছুটছে। খুব অসহায় লাগছে বুড়ি মাসি। অপুর বাবাকে বলো পুলিশকে খবর দিক। শুনতে পারছো বুড়িমাসি?

উফফ কি জ্বালাতন, কেউ একটা সাড়া করে না। কে কাঁদছে যেনো, কি হলো আবার! আজ যে কার মুখ দেখে বেড়িয়েছি। ফোনে রিং হলো আমি ওদের কথা শুনতে পেলাম আমার কথার কোনো উত্তর দিলো না কেনো বুড়িমাসি? বাড়িতে কারো কিছু হলো নাকি?

চারদিকের এতো চাপ আর নিতে পারছি না। প্রচন্ড মাথা ব্যাথা করছে। ছিঁড়ে যাচ্ছে যন্ত্রণায়। আচ্ছা বাসে এতো লোক কারো কোনো উদ্বেগ নেই কেনো? সবাই কি এটা এঞ্জয় করছে? আরে আমার যাবার পথে লাইন দিয়ে থাকা এই হসপিটাল গুলো তো দেখি নি কখনও। আজ আর অফিস যাওয়া হবে না। বাস থামলে বাড়ি ফিরে যাবো। ছেলেটা কদিন ধরেই আমার হাতের হিংয়ের কচুরি খেতে চাইছে। না আজ ফিরেই যাবো, শরীর ভালো লাগছে না। ফোনে নেটওয়ার্ক নেই। মেসেজ করে জানাবো  তার উপায় নেই। আজ পরের বাস টা ধরলেই ভালো হতো। খুব ঠান্ডা লাগছে। জ্বর আসবে মনে হচ্ছে। এই মার্চ মাসেও এতো ঠান্ডা! গায়ে আঁচল জড়িয়ে ও কিছু হচ্ছে না। এ দিকে এতো মাথা ব্যাথা করছে। কি যে হচ্ছে ঠাহর করতে পারছি না।

পাশের সিটের দাদাকে একবার রিকুয়েস্ট করি না হয় বাস থামাতে বলুক ড্রাইভার কে। দাদা একটু বলুন না বাস থামাতে, আমার শরীর ভালো লাগছে না। আমি নেমে যেতে চাইছি। পাশের সিটের দাদা ফোনে কথা বলছে। মনে হয় বাড়িতে জানাচ্ছেন আজকের এই ভয়াবহ বাসযাত্রার কথা।

দাদা কি হয়েছে? কাঁদছেন কেনো ?

আমার বাড়িতে কারা যেনো কাঁদছে! বুঝতে পারছি না কে বা কেনো কাঁদছে। আজ যে কখন বাড়ি যাবো জানি না।

বাসের সবাই ফোন করছে বাড়িতে। এক সাথে এক বাস লোককে ফোন করতে দেখি নি কখনো।

খুব শীত করছে। মাথা যন্ত্রণা। মন খারাপ করছে বাড়ি ফিরতে পারবো তো?

উফফফফফফফ অবশেষে বাসটা দাঁড়িয়েছে। এটা কোনো বাসস্ট্যান্ড নয় তো। হাসপাতাল মনে হচ্ছে। আরে অপু আর অপুর বাবা না? হ্যা তাই ই তো। ওরা কি করে জানলো আমাদের বাস এখানে দাঁড়াবে ?

অপু অপু শিগগির আমায় বাড়ি নিয়ে চল। তোর বাবাকে বল একটা ট্যাক্সি ডাকতে। শরীরটা খুব খারাপ লাগছে রে। মাথা ফেটে যাচ্ছে, শীত করছে। অপু বাবাকে বল, কি করছিস তোরা? আরে এই অপু এত কাঁদছিস কেনো? কি মুশকিল, তোদের সামলাবো নাকি বাড়ি যাবো। আজ তোকে হিংয়ের কচুরি করে দেবো। প্রমিশ।

হাসপাতালের ভেতর অপু কাকে জড়িয়ে কাঁদছে এতো? এ কি আমি? সাদা চাদরটা দিয়ে আমার শরীর ঢেকে দিচ্ছে অপুর বাবা। আমি কি আর নেই? এই তো আমি সব দেখতে পারছি। তবে? আমার ব্যাগের ভেতর সেলফোন টা সমানে বেজে যাচ্ছে। বাসের সব যাত্রীর ব্যাগে সেল ফোন বাজছে। ক্রিং ক্রিং ক্রিং ক্রিং ক্রিং ক্রিং ক্রিং ক্রিং। উফফ অসহ্য।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here