শব্দঃ জন্ম ও মৃত্যু-৫/ ক্ষান্ত// জয়কৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়

0
116

ক্ষান্ত

জয়কৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়

আশ্রমের পাশে নদী। গুরু শিষ্যদের বললেন যতটা সম্ভব সংক্ষেপে নদীপথটি বিবৃত করতে। সকলেই বলে, কিন্তু সংক্ষিপ্ত হয় কই! গুরু বিমর্ষ হন।

 নিরেট মাথার নিরেট ভালোমানুষ একটি ছেলে আশ্রম পরিস্কারের কাজ করে। সে বিমর্ষ গুরুকে দেখে বলে উঠল “ইস”।

ব্যাস! আর যায় কই! গুরু লাফিয়ে উঠলেন। জড়িয়ে ধরলেন ছেলেটিকে। বললেন, “সার্থক। দেখো, দেখো তোমরা। একে বলে সাধনা। এর চেয়ে সংক্ষিপ্ত আর হয় না। নদীপথটি এক্কেবারে যেন লাঙলের ফলা, যাকে বলে ঈষ”।

ছাত্রদের কেউ মুগ্ধ, কেউ ঈর্ষাকাতর। কিন্তু কে না জানে “সৎ” মানুষ দরিদ্র হবেনই আর ভালোমানুষ বোকা। সুতরাং আমাদের এই ভালোমানুষ ছেলেটি নিজেকে ভেবে বসল সত্যিই কত কিছু জানে সে!

গল্পটি বড়। আমারও স্বাধীনতা আছে বলার। তাই সংক্ষেপে বলেই ফেলি।

 কবি কে তা সংজ্ঞায়িত করার সময় ছেলেটি একটি শব্দে উত্তর দিল “ইস”। গুরু বুঝলেন “ঈশ”, এবং আত্মহারা হলেন। বললেন “ঠিক। ঈশ্বরকেই তো কবি বলা হয়!” আর আমার বন্ধু ছেলেটি বুঝল “বেশ মজা তো! সব কথায় “ইস” বললেই গুরু খুশি।”

এরপর কোন একদিন দুরূহ কোনও আলোচনায় ছেলেটির স্বতঃস্ফূর্ত মন্তব্য “ইস” গুরুর বিরক্তির কারণ হল। আর তাতে আমার বোকা বন্ধুটি জানতে চাইল, “বাঃ রে! এর আগের সব ব্যাপারে ইস বলাতে আপনি কত খুশি হলেন, আর এখন রেগে যাচ্ছেন কেন?”

 গুরু বুঝলেন ইস! কত বড় ভুল করেছেন তিনি।

এতদূর ধৈর্য্য ধরে আসার পর এ স্বাভাবিক প্রশ্ন, আজকের শব্দ তো “ক্ষান্ত”, তাহলে এই “প্যাঁচাল পাড়া” কেন বাপু? অবশ্য অনেকেই বুঝে গেছেন। তবু যাঁরা বুঝেও আমায় ভালোবেসে জানতে চাইছেন আমি কি বলি, তাঁদের জন্য বলি, বিলকুল “বলি” হতে চলেছি এবারে। দগ্ধ-বিদগ্ধজন নয় সত্যি সত্যি গুণীজনেরাও আমার এই ধারাবাহিক, “ধারাবাহিক” পড়ছেন আর আমার অবস্থা হচ্ছে গল্পের ভালোমানুষটির মত। সুতরাং “ক্ষান্ত”তে এসে ক্ষান্ত হওয়াই সমীচীন। কিন্তু সম্পাদকমশাই গাজর ঝুলিয়ে দিলেন! “আপনার লেখা কিন্তু অনেকেই পড়েন”। এর পরেও কি আর গাধার থেমে থাকা সম্ভব?

সৈয়দ মুজতবা আলী তখন জার্মানিতে। সংস্কৃত নিয়ে উচ্চতর পড়াশোনার জন্য এসেছেন দুই তরুণী। আলী সাহেবের প্রতি অপার শ্রদ্ধা নিয়ে তরুণীদ্বয় এলেন পরিচয় করতে। আলী সাহেব সব শুনেটুনে প্রথমেই বললেন, “ভাষা শিখতে এসেছ? বেশ। তো দু-চারটে খিস্তি দাও দেখি। কোনও ভাষায় সেই সাবলীল হতে পারে, যে কিনা সেই ভাষায় সুন্দর গালাগালি দিতে পারে!” মস্করা কি না জানি না। তরুণীদ্বয়ের গালের রঙ তখন গোলাপী হয়েছিল কি না, তাও জানা নেই। এমনকি এও জানি না যে এতেই উদ্বুদ্ধ হয়ে কেউ কেউ অশ্লীল ভাষার উপর গবেষণা করে ডিগ্রী পেলেন কি না। কিন্তু আমি বেশ উজ্জীবিত! আর তার উপর খোদ আলী সাহেবের কথায়, “আম্মো হালা বাঙালের পো, আম্মো হালা কম কিসে?”

তাছাড়া “ক্ষ” যদি ক্ষয়ের আদি হয় তো তাতে আস্থা রেখে সয়ে থাকাই “ক্ষম্”, যা কিনা পরে “আ” যুক্ত হয়ে একটি স্ত্রীশব্দ হবে, “ক্ষমা”। আর ক্ষান্ত তো সেই ক্ষম্ কে স্থাপিত করতেই “ত” (ক্ত) যোগে সাধিত। একেবারে নিখাদ যোগ সাধনা! সুতরাং আমি এখনই ক্ষান্ত না দিলেও সয়ে যাবেন নিশ্চয় সকলে।

বই খুব মজার। বেশ পাদটীকা জোড়া যায়। কিন্তু এখানে সে অবসর নেই যে নীচে জুড়ে দেব। সকল সমৃদ্ধ ভাষাতেই শব্দেরও লিঙ্গভেদ আছে। সংস্কৃত ভাষাতেও পুং, স্ত্রী, ক্লীব এবং উভলিঙ্গ সকলই উপস্থিত। অর্থাৎ তৃতীয় লিঙ্গের এই বিলক্ষণ স্বীকৃতি কিন্তু সেই আদিতেও যথেষ্টই সমাদৃত।

 তো সে যাই হোক, “ক্ষান্ত” যেহেতু ক্ষমার বেশ কাছাকাছি, শব্দটি পৌরাণিক কালে দেবীর এক সহচরী হয়ে গেলেন ও বেশ পূজাও পেতে লাগলেন। তারপর যেমন হয় আর কি, গ্রাম বাংলায় ফর্সা টুকটুকে “কালী”, “নেত্যকালী” বা কালোকেলে “দুর্গা” “সরস্বতী”র পাশাপাশি “ক্ষান্তমণি”রাও বিরাজ করতে লাগলেন। অবশ্য এই মতও প্রচলিত যে, তুমুল “পরিবার অ-পরিকল্পনা”র যুগে আর যাতে সন্তান, বিশেষ করে কন্যাসন্তান না হয় সেই বাসনায় নাম রাখা হত ক্ষান্ত। মানে অনেক হয়েছে, এবার ক্ষান্ত দে মা! যদিও তাতে ফল হত কি না তার যৌক্তিক ব্যাখ্যা জানা নেই!

তো এরপর বাঙালী যত আধুনিক ও ক্রমে উত্তর আধুনিক হল দুর্গা, কালীই অচল তো ক্ষান্তমণির কি ক্ষমতা! এমনকি শব্দটির প্রায়োগিক ব্যবহারও বড় সেকেলে বিবেচনায় “থামা”টাই শ্রেয়।

অবশ্য আমার বিশ্বাস “উত্তর”-এর পর “উত্তরোত্তর” “উত্তর-উত্তরোত্তর” ইত্যাদিক্রমে ক্রমেই উত্তরে যেতে যেতে একসময় আবার স্বস্থানেই ফিরে আসা যাবে। কারণ পৃথিবীটা শেষ পর্যন্ত গোল! সুতরাং এখন যেমন বাছা-বাছা বৈদিক শব্দ পুনঃব্যবহার শুরু হয়েছে সেরকমই ডোডোপাখী “ক্ষান্ত” হয়তো একদিন ফিনিক্স হয়ে তার “শ্রী” ফিরে পেতেও পারে।

জয়কৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here