অণুগল্পঃ ছন্নছাড়া গৃহহারা বাউন্ডুলে / জীৎসোমা বন্দোপাধ্যায়

0
40

ছন্নছাড়া গৃহহারা বাউন্ডুলে

জীৎসোমা বন্দোপাধ্যায়

বছর চল্লিশের ডিভোর্সড নেহার আর ইমরানের আলাপ ফেসবুকে। নেহার একটা ছবি পোস্ট করা নিয়েই কথা শুরু করে ইমরান। ইমরান বাংলাদেশের মানুষ। শিক্ষিত। বিবাহিত। এক কন‍্যার পিতা।সে ভারতবর্ষে বেড়াতে আসতে চায় এবং নেহার কাছে জানতে চায় ভারতবর্ষের কি কি দ্রষ্টব্য স্থান আছে। নেহা সেইটুকু কথার উত্তর দিত যেটুকু ইমরান জানতে চাইত। ইমরানের ল‍্যান্ডস্কেপ তোলার হাত খুব ভালো। তারপর আস্তে আস্তে তাদের বন্ধুত্ব গড়ে উঠল। আপনি হল তুমি। নেহার মনে হল ইমরান লোকটা ভালো। কিন্তু কিছু দিনের মধ্যেই ইমরান নেহার প্রেমে পড়ে গেল। নেহা বুঝতে পেরেছিল কিন্তু তার মনে সেরকম কিছু ছিল না। ইমরান একদিন বলেই ফেলে তার ভালোবাসার কথা।নেহা তাকে বুঝিয়ে বলে যে সে বিয়েতে বিশ্বাস করে না। সে যেমন আছে ভালো আছে। নেহা ইমরানকে শ্রদ্ধা করে, তার ভালোবাসাকে খাটো করে দেখেনা। কারণ ভালোবাসা তো আর বিয়ের গ‍্যারান্টি কার্ড নয় যে বিয়ের সাথে আসবে। কিন্তু ইমরান ও নিজের মনের হাতে নিরুপায়। তার ওপর তার বিবাহিত জীবন সুখের নয়। সে উঠে পড়ে লাগে নেহাকে বোঝাতে। নেহা বড়ো শক্ত ঠাঁই।

আজ নেহা খুব আহত। সে পরাস্ত। সে ইমরানকে বোঝাতে পারেনি নিজেকে। গতকাল ইমরান তাকে বলে,

” তুমি তো বিয়ে করে সন্তান নিতেই পারো।”

” এই বয়সে? দূর।”

” কেন? Nothing is impossible. তুমি চাইলেই হবে”।

” Nothing is impossible. ঠিক। কিন্তু তাই বলে সেটা পরীক্ষা করতে যাওয়া উচিৎ নয়। যে বয়সে যা করা উচিৎ সে বয়সে তাই করতে হয় না হলে তার কুফল ভুগতে হয়। আমার এই বয়সে সন্তান হলে যখন ওর বয়স কুড়ি হবে আমার ষাট হবে। মরেও যেতে পারি। তারপর ওর কি হবে?”

” দেখো ভগবান চাইলে সব হবে।”

“আমি চাইনা। আমি তোমাকে আগেও বলেছি আমি যেমন আছি ভালো আছি।” আমি আমার জগতে খুব আনন্দে থাকি। তুমি অযথা আমাকে এসব বলোনা। আমার মনে কোনো কামনা,বাসনা আকাঙ্খা,স্বপ্ন,ভালোবাসা কিছু নেই। আছে শুধু শান্তি। এ শান্তি আমি কিছুতেই নষ্ট করতে দেব না।”

” ভগবান চাইলে আমার পুত্র সন্তান হবে কন‍্যা জন্মানোর পনেরো বছর পর। মা আলাদা হতে পারে। তাছাড়া আমি চাইনা আমার পর আমার সম্পত্তি ভূতে লুটে পুটে খাক।”

নেহা এটা শোনার পর সারা রাত ঘুমোতে পারেননি। মনটা তার প্রচন্ড ভারাক্রান্ত। সকালে উঠে দেখল আজ ইমরানই শুভ সকাল লিখেছে। নেহা তাকে লিখল,” একটা কথাই ভাবলাম সারা রাত। তোমাদের দেশের প্রধানমন্ত্রী একজন মহিয়সী নারী। কোন দুনিয়ায় বাস করো দোস্ত? তোমার অমন সুন্দর নিষ্পাপ এক কন‍্যা আছে। কোথায় তুমি তাকে এমন ভাবে মানুষ করবে যাতে সে দশটা পুত্র সন্তানকে টেক্কা দিতে পারে তা না তুমি তার জন্মের পনেরো বছর পর এক পুত্র সন্তান লাভের আশা রাখো তাও আবার আমার সঙ্গে। হাসব না কাঁদব বুঝতে পারছি না। আমি কি ভুল করে তোমাদের দুনিয়ায় জন্মেছি? কখনো ভেবেছ আল্লাহ কেন তোমাকে কন‍্যা সন্তানের পিতা করেছেন? যাতে তুমি বোঝো যে আল্লাহ তোমাকে সব থেকে ভালো উপহার দিয়েছেন। তার যত্ন করো। দোস্ত মানুষের যা আছে মানুষ তাতে সন্তুষ্ট নয়, তার কোনো মূল্যই নেই। যা নেই তার পিছনে ছুটে মরে। মেয়েরা কি শুধু শরীর? সন্তান জন্মদানের মেশিন? ভালোবাসা ভালোবাসার জন্য কোনদিনও সম্মান পাবেনা? তুমি তো এটুকুও বোঝার ক্ষমতা রাখো না যে আমি একটা মেয়ে হবার আগে একটা মানুষ।” 

নিজেকে সামলে নিয়ে আবার লিখল,” আমি একটু ঐ রকম আছি। দার্শনিক টাইপ। গতে বাঁধা নিয়মগুলো কোনো দিন মেনে চলিনি। 

ছন্নছাড়া গৃহহারা বাউন্ডুলে”। তারপর আর কিছু বলতে ইচ্ছে হলনা ওর। 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here