শব্দঃ জন্ম ও মৃত্যু-৬/ শ্রী// জয়কৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়

0
64

শ্রী

জয়কৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়

ধারা অনুসারে এবারের পর্ব “শ্রী”যুক্ত হওয়াই যুক্তিযুক্ত। কিন্তু সংশয় আছে। নিজের উপরে তো বটেই। শব্দটির উপরেও কম নয়।

নিখাদ সংস্কৃত শব্দটির আদত অর্থ “সকলে যাঁকে সেবা করে”। কিন্তু আদতে শব্দটিকে সে অর্থে ব্যবহার করা হয় না মোটেও। বরং “শ্রী” হলেন বৈষ্ণবকুলের প্রাণের ধন শ্রীলক্ষ্মীদেবী! তাহলে কি দ্বিরুক্তি দোষ হল না? না হে, বৈষ্ণব মতে যে, তত্ত্ব গভীর। সেই অর্থে যা অস্তি, অর্থাৎ যা বর্তমান এবং সদর্থক তাই “শ্রী”। বিষ্ণুর হ্লাদিনী শক্তি চিরকালীন এবং সদর্থক। তাই সেই হ্লাদিনী শক্তি স্বয়ং বিষ্ণুসহ সকলেরই সেবা পাওয়ার যোগ্য। সেজন্যই সে হ্লাদিনী শক্তি “শ্রী”।

আবার এই হ্লাদিনী শক্তিই জগতের জীবনালোক। সুতরাং জীবনালোক আছে যাঁর তিনিই “শ্রী”যুক্ত। এখন এই হ্লাদিনী শক্তির মূর্তরূপ হলেন লক্ষ্মী। সেজন্য “শ্রী” অর্থে লক্ষ্মী হলেও “শ্রীলক্ষ্মীদেবী” দ্বিরুক্তি দোষে দুষ্ট নয়।

বাঙালির কাছে লক্ষ্মী, তা সে যতই চঞ্চলা হন না কেন, শান্ত-শিষ্ট, ঘরের বধূ, যাঁর আবার বুক ভরা মধু! সুতরাং যা সুন্দর তাই “শ্রী”। অপভ্রংশে অথবা কখনও ব্যঙ্গার্থে “ছিরি”।

তো সে “ছিরিছাঁদ” যাই হোক, “শ্রী” যোগে সকল “শ্রী”ই মজবুত করে গড়ে তোলার প্রয়াসে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথও লাবণ্যকে(শ্রী শব্দের আর একটি অর্থ) “লাবণ্যশ্রী”তে পরিণত করেছিলেন। তো আমাদের মত ইতরজনের শ্রীযুক্ত হতে আর বাধা কি! তার উপর সাহেব-সুবো ইংরেজ প্রভুরাও যখন সম্মানার্থে (জেনে বুঝেই ব্যঙ্গার্থে নয় তো!) এদেশীয় বিশিষ্টজনকে “বাবু” সম্বোধন করতে লাগলেন তখন আর “শ্রীযুক্ত বাবু অমুক”, “শ্রীমতী অমুক” হতে কার না মন চায়!

শুধু কি নামে! “শ্রী” যুক্ত সকল তৎসম, তদ্ভব এমনকি “শ্রী” অথবা গ্রাম্য কথ্য “ছিরি” যোগে নিষ্পন্ন শব্দেরও তুমুল ব্যবহার হল চালু। এমনকি বিধবা অর্থে সর্বৈব ভুল “শ্রীমত্যা” কথাটিও প্রচলিত হল। এরই মাঝে “শ্রীঘর” যে কোন রসিকজনের সৃষ্টি!

শাসন করার সুদূর লিপ্সা থেকেই ইংরেজ প্রভুরা এদেশের অপর দলকে আবার প্রচ্ছন্নভাবে বোঝাতে সাহায্য করলেন যে অপরের “শ্রী” গ্রহণ করলে আর আপন “শ্রী” থাকে কই! বরং “আমরা সবাই রাজা”র দেশে (গানে ও কল্পনায় মাত্র!) নামের আগে “জনাব” লিখে নিজেকে “জনাব” ভাবতেও যথেষ্ট সুখ!

এদিকে এ দল বঙ্কিমের “বাবু” নিয়ে বাঁকা আলোচনা যতদিনে হৃদয়ঙ্গম করল, ততদিনে এ দলের অধিকাংশই “আধুনিক ও স্মার্ট” হয়ে “শ্রীযুক্ত বাবু” থেকে সব ঝেড়ে ফেলে স্মার্ট “শ্রী”তে পৌঁছে গেছে।

আরও স্মার্ট, বলা ভালো একেবারে উত্তর আধুনিক পর্যায়ে পৌঁছে এ দল এবারে “মিস্টার”, “মিস”, “মিসেস” ব্যবহারের জন্য সম্পূর্ণ “শ্রী”হীন হওয়াই সমীচীন বোধ করলেন। সেসময়টা আবার স্বাধীনতার পরের চূড়ান্ত স্বাধীনতার যুগ! কিন্তু কি অদ্ভুত কাকতলীয়ভাবে এপার বাংলায় “আ মরি বাংলা ভাষা”ও সেই সময় থেকেই শ্রীহীন হতে শুরু করল। অবশেষে আজ এমন দিন যে, “এ ভাষা এমন কথা বলে/বোঝে রে সকলে…” ভাষাটির জন্য আন্দোলনকারীদের অনেকের কাছেই মাতৃভাষায় স্বাক্ষর করাটাও “তামাদি”!    (চলবে)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here