ঐতিহাসিক শহর তমলুকের মহাভারতীয় রাজবাড়ি জুড়ে শুধুই ধ্বংসস্তুপের হাহাকার

0
105

ঐতিহাসিক শহর তমলুকের মহাভারতীয় রাজবাড়ি জুড়ে শুধুই ধ্বংসস্তুপের হাহাকার

সঞ্জয় গায়েন  

তাম্রধ্বজ।তমোলিপ্তী। তমোলিপ্ত। তাম্রলিপ্ত।তাম্রলিপ্তী। তামলিপ্তং। তমালিকা। তমালিনী। নানা নামে পরিচিত। তবে পুর্ব মেদিনীপুর জেলার এই ঐতিহাসিক শহরের বর্তমান নাম তমলুক।  

নানা নামের মতো এর গড়ে ওঠা নিয়েও নানা মত। কেউ বলেন, মহাভারতের দ্রৌপদীর স্বয়ম্বর সভায় উপস্থিত ছিলেন যে ময়ূরবংশীয় রাজা ময়ূরবর্ধন তিনি এর প্রতিষ্ঠাতা। তাইতো এখানে গেলে আজও শোনা যায়, পাণ্ডবদের অশ্বমেধের ঘোড়া আটকানোর গল্প। বলা বাহুল্য এখনও রাজবাড়ির পিছনদিকের আস্তাবলে একটি ঘোড়া বাঁধা আছে।

 প্রাচীন জনপদ তমলুকের উল্লেখ পাওয়া যায় চৈনিক পরিব্রাজক ফা-হিয়েন ও হিউয়েন সাঙ এর রচনায়। তাই ১৩শ শতাব্দীতে কালু ভুঁইয়া তমলুক রাজবাড়ির প্রতিষ্ঠা করেন এবং  ১৬শ খ্রীষ্টাব্দে মুঘলদের কাছ থেকে রায় উপাধি পান ব’লে যারা দাবি করেন তাঁদের মতবাদ নিয়ে সংশয় থেকে যায়।

তবে যা নিয়ে সংশয় নেই তা হল ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে এই রাজবাড়ির অবদানের কথা। ১৯৩০ সালে লবণ সত্যাগ্রহ আন্দোলনের সময়ে এই বাড়িটিতেই সত্যাগ্রহীদের থাকার ব্যবস্থা হয়েছিল।

আমাদের প্রিয় নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুকে যখন বৃটিশ সরকার তমলুকে সভা করার অনুমতি দিচ্ছিল না, এই রাজবাড়ির দেশপ্রেমিক রাজা সুরেন্দ্রনারায়ণ রায় (ময়ূরবংশীয় ৬১ তম রাজা অন্যমত অবশ্য মুঘল আমলে পাওয়া ‘রায়’ উপাধি যুক্ত রাজ পরিবারের উত্তরপুরুষ)   এখানেই সুভাষচন্দ্রের সভার আয়োজন করেন। সেই ঘটনাকে স্মরণে রেখে রাজবাড়ির পিছনদিকে রাজা সুরেন্দ্রনাথ রায় ও সুভাষচন্দ্র বসুর শ্বেতপাথরের মূর্তি স্থাপিত হয়েছে যা তমলুকের গর্ব।

রাজা সুরেন্দ্রনাথ রায় ও নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুর মূর্তি। ছবিঃ প্রতিবেদক

এ প্রসঙ্গে আর একজন বীরাঙ্গণার কথা না বললেই নয়, তিনি হলেন মাতঙ্গিনী হাজরা। তমলুক রাজবাড়ির সঙ্গে এঁর বীরগাথা জড়িয়ে না থাকলেও তমলুক শহরের সঙ্গে তো তিনি জুড়ে আছেন। রাজবাড়ির প্রবেশপথেই যে তমলুক থানা সেখানেই একদিন বৃটিশ পুলিশের গুলিতে তিনি ঝাঁঝরা হয়ে গিয়েছিলেন। যার সাক্ষীস্বরূপ অদূরে তমলুক কোর্টের পাশে তাঁর স্মৃতিস্তম্ভ আজও বিরাজমান।

তবে এ হেন রাজবাড়ির রাজপ্রাসাদ এখন শুধুই ইতিহাস। বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে যাচ্ছে। এই রাজবাড়ির সঙ্গে যতই মহাভারত বা স্বাধীনতা সংগ্রামের সম্পর্ক থাকুক না কেন তা রক্ষণাবেক্ষণের কোন ব্যবস্থা হয় নি। আর তাই এর স্বাভাবিক পরিনতি কঙ্কালসার চেহারা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা।গথিক আর্চে গ্রিক-রোমান আর্কিটেকচার আদলে গঠিত রাজবাড়ির প্রতিটা ইঁট জুড়ে শুধুই হাহাকার।তমলুক হাসপাতাল মোড় দিয়ে বেরিয়ে ঐতিহ্যবাহী ও সুসজ্জিত তমলুক রেলস্টেশনে চলে আসার পরও সেই হাহাকার শোনা যাচ্ছিল। ভারাক্রান্ত মন নিয়ে তবুও চলে আসতে হয়। তবে হয়তো আগামীতে ঘুরতে ঘুরতে আবারও কখনো ঘুরে আসা যাবে এই তমলুক থেকে।

প্রতিবেদক-সঞ্জয় গায়েন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here