অণুগল্প: ঘুরপথ //সুব্রত ভৌমিক

0
51

ঘুরপথ
সুব্রত ভৌমিক

                                     ১
এক গ্রীষ্মের মুখে লোকটা মনকে বোঝাল, ‘সবই যায়।’
     যে থাকবে না, টের পেল। লোকটার কাছে গান শিখত। কিন্তু একদিন তার বাবা ডেকে জানাল, মেয়ে আর শিখবে না। ভাল এক সম্বন্ধ এসেছে। ভাল পাত্র, দোতলা বাড়ি, পয়সাকড়িতে ভারি মনোযোগ।
     অতএব ‘ভাল সম্বন্ধ’র ঘরে চলে গেল সে।
     রাতে অসহ্য গরম। অনেক রাত অব্দি লোকটা বিছানায় এপাশ-ওপাশ করল। ঘুম আসে না। একবার মনে হল, দরজাটায় কে যেন শব্দ করল। খুলে দেখল কেউ না, হাওয়া।

                                    ২
জীবন ফেরে না কোথাও, পৌঁছায়।
     আশ্বিনে এভাবে সে বাড়ি এল। দেখা হল। খুব সেজেছে। গা ভর্তি গয়না, প্রসাধন। ভাল দেখা যায় না। হাতে একদম সময় নেই। ব্যস্ত। তার মধ্যে সাড়ম্বরে জানাল, গত মাসেই তারা একটা গাড়ি কিনেছে। স্বামী খুব পটু। এবার একটা ফ্ল্যাট কেনার জন্য খুব ছুটোছুটি করছে।
     লোকটা হাসল, ‘বাঃ।’
     ‘ইদানিং অবশ্য অনেক রাত করে বাড়ি ফেরে। কী কাজ। কোনও কোনও রাত ফেরে না।’
     লোকটা ফের হাসল।
     চলে গেল সে।

                                   ৩
গেল শীতে লোকটার বাড়ির সামনের রোদটা চুরি গেল। সামনের বাড়ির দশ লাখ বিশে চাকরি বাঁধানো লোকটা গুরুগম্ভীর মুখে তেতলা তুলেছে। তাতে সুদৃশ্য বউ এনেছে।
     দিনের শেষে বউটি এখন গ্রিল ধরে বারান্দায় এসে দাঁড়ায়। যেন একটু নিজের কাছে আসে। কিন্তু থাকতে পারে না। পরক্ষণে স্বামীর ডাকে ঘরে ঢুকে পড়ে। টিভি দেখে। দরজাটা ‘দড়াম’ শব্দে বন্ধ হয়ে যায়। বাইরের আকাশে তখন তারা ভরা রাত, চাঁদের আলোয় ভেসে যাচ্ছে চরাচর।
     ও হ্যাঁ, হেমন্তে সে এসেছিল। মুখটা কেমন হলদে। পড়া বিকেলের মতো৷ থাকেনি। নাকি পারেনি?

                                    ৪
হঠাৎই এগাছে-ওগাছে এক কোথাকার হাওয়া। দূরে নারকেল গাছগুলো আবেশে নুয়ে নুয়ে পড়ছে। পাখিগুলো বাতাসে গা ভাসিয়ে দিয়েছে। যেন লোকটার পাশ কাটা জীবনটার দিকে মিটিমিটি তাকিয়ে কী একটা খবর কানাকানি হচ্ছে। ঠোঁটে চাপা হাসি। লোকটা অবাক হয়ে চারদিক দেখল। কে এসেছে! কে!
     শুনল, সে এসেছে।
     সে এলে পাখি ডাকে, হাওয়া বয়। লোকটা ভয় পেল। বুক দুরদুর করতে লাগল। পরদিন ভোর থাকতে সাত-তাড়াতাড়ি একটা কাজে বেরিয়ে গেল। ফিরল দুপুর করে। বিকেলের দিকে সুরমণ্ডলটা নিয়ে বসল। তারপর মুলতানিতে সবে মরমী অন্তরাটা ধরেছে, দরজায় এক ছায়া।
     গান থেমে গেল, ‘কে!’
     ‘আমি।’
     সন্ধে লাগা দুয়ার। কামিনী গাছটা থেকে একটা হাল্কা গন্ধ আসছে। দেখল, সে।
     আস্তে বাজল, ‘আসব?’
     এল। হাতে শাখা-পলা নেই। সিঁদুর মোছা কপাল। মাস দুয়েক হল। আর ফিরবে না। সঙ্গে গানের খাতা। লোকটি আস্তে মুখ খুলল, ‘আবার এলে যে?’
     উত্তর এল, ‘হ্যাঁ, একটু দেরি হয়ে গেল।’

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here